ঢাকা সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
২০ °সে

ঝুঁকি নিয়েই চলছে পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের ১৪৭ ট্রেন!

ঝুঁকি নিয়েই চলছে পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের ১৪৭ ট্রেন!
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পলাশবাড়ী নামক স্থানে রেললাইন ভেঙে যাওয়ায় লাল কাপড় টাঙিয়ে রেলযোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয় —ইত্তেফাক

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে একপ্রকার ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে ১৪৭টি ট্রেন। নতুন রেললাইন নির্মাণের সময় পুরোনো লাইন ব্যবহারসহ অন্য কারণে এই জোনের অধীনে কয়েকদিনের ব্যবধানেই ঘটেছে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা। এর মধ্যে দিনাজপুরে চার দিনের ব্যবধানে ঘটেছে দুই স্থানে রেললাইন ভেঙে যাওয়ার ঘটনা। বন্ধ থেকেছে রেল চলাচল। আর গত বৃহস্পতিবার সিরাজগঞ্জে ঘটেছে ছয়টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা। রেলওয়ে বিভাগ রেললাইনের এই অবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করতে না চাইলেও ঝুঁকির মাত্রা নির্ণয়ের জন্য আধুনিক সরঞ্জামাদি না থাকার কথা স্বীকার করছেন।

গত ৬ নভেম্বর খুলনা থেকে ‘সীমান্ত এক্সপ্রেস’ নামে একটি আন্তঃনগর ট্রেন পার্বতীপুর আসার সময় দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার পলাশবাড়ী রেলক্রসিং অতিক্রম করতে গেলে রেললাইনের এক ফুট অংশ ভেঙে যায়। পেছনের শেষ বগিটি পার হওয়ার সময় লাইনটি বিকট শব্দে ভেঙে যাওয়ায় অল্পের জন্য রক্ষা পায় সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনটি। এরপর উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার সঙ্গে সাড়ে ছয় ঘণ্টা বন্ধ থাকে সারাদেশের রেলযোগাযোগ। পরে রেললাইন মেরামত করে দুপুর ১২টায় আবার শুরু হয় রেলযোগাযোগ। স্থানীয় অধিবাসী আব্দুল মান্নান জানান, এখানে রেললাইন ভাঙার ঘটনা এটিই প্রথম নয়, এর আগেও এখানে বেশ কয়েকবার অনুরূপ দুর্ঘটনা ঘটে। এর চার দিনের মাথায় গত ১০ নভেম্বর দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার হোসেনপুর এলাকায় রেললাইন ভাঙা দেখে রেলওয়ের দুই খালাসি লাল পতাকা উড়িয়ে ট্রেন থামানোর সংকেত দেন। ফলে দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যায় ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী আন্তঃনগর ট্রেন ‘দ্রুতযান এক্সপ্রেস’।

সবশেষ ঢাকা থেকে লালমনিরহাটগামী লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনটি সিরাজগঞ্জের লাহিড়ী মোহনপুর স্টেশনে লাইনচ্যুত হয়ে ছয়টি বগি পড়ে যায়। এতে তিনটি বগিতে আগুন লাগে। এই দুর্ঘটনার ফলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সারাদেশের রেলযোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও অহরহ ঘটছে ছোটোখাটো দুর্ঘটনাসহ লাইনচ্যুতির ঘটনা। পুরোনো লাইন ব্যবহারের ফলে বেশ কিছু জায়গার রেললাইন তার ধারণ ক্ষমতা ও গুণগত মান হারিয়েছে। এ কারণেই বিভিন্ন স্থানে রেললাইন ভেঙে যাচ্ছে এবং লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে বলে জানান রেলওয়ে বিভাগের কর্মকর্তারা।

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের প্রধান প্রকৌশলী মো. মাসুদুর রহমান জানান, ২০০৩ সালে এই অঞ্চলে ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণের সময় অনেক স্থানে পুরোনো লাইন ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে বেশ কিছু লাইনের বেশি লোড নেওয়ার ক্ষমতা নেই। এ কারণেই বিভিন্ন স্থানে রেললাইন ভেঙে যাচ্ছে। এসব লাইনের জিএমটি লোড নেওয়ার ক্ষমতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে মেকানিজম সার্ভে (জরিপ) চলছে বলে জানান তিনি। তবে এই সার্ভের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান বলেন, রেলওয়ে আধুনিকায়ন হলেও এখনো রেলওয়ে বিভাগের আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। রেললাইনের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য রেইল ফ্লো ডিটেক্টর মেশিন দরকার। কিন্তু রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনে কোনো রেইল ফ্লো ডিটেক্টর মেশিন নেই। শুধু পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনেই নয়, সারাদেশের কোথাও এই মেশিন নেই বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই মেশিন আমদানির চেষ্টা চলছে। এটা আসলেই দুর্ঘটনার আগেই রেললাইনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এবং এতে দুর্ঘটনার হাত থেকে ট্রেন রক্ষা পাবে।

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, শীতকালে রেললাইনের সংকোচন হয় এবং গরমের সময় হয় প্রসারিত। পুরোনো লাইনগুলো তার ধারণ ক্ষমতা হারানোর ফলে শীতকালে সংকোচন হয়ে বিভিন্ন স্থানে ভেঙে যাচ্ছে। রেলওয়ের বিভাগের একটি সূত্র জানায়, রেললাইন মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ করার জন্য রেলওয়ে বিভাগের কি-ম্যান রয়েছে। একজন কি-ম্যানের প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার রেলপথ পায়ে হেঁটে পরিদর্শন করার কথা। প্রতি ইঞ্চি লাইন তার নিজ চোখে দেখে ত্রুটি ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে মিস্ত্রি (মেট) ডেকে মেরামত করার কথা।

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের প্রধান প্রকৌশলী মো. মাসুদুর রহমান আরো জানান, পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের মোট ১ হাজার ৬০১ কিলোমিটার রেলপথে নিয়মিত চলাচল করে ১৪৭টি ট্রেন। এর মধ্যে ৪৬টি আন্তঃনগর, ৪৬টি মেইল এক্সপ্রেস ও কমিউটার ট্রেন, ৪৯টি লোকাল ট্রেন এবং ছয়টি মালবাহী ট্রেন।

ইত্তেফাক/এমআরএম

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন