ঢাকা সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
২১ °সে

স্বামীর দেওয়া নতুন শাড়ি পরে চিরবিদায় নিলেন অ্যানি বড়ুয়া

প্রথম জন্মদিনে বাবাকে হারাল মিফতা
স্বামীর দেওয়া নতুন শাড়ি পরে চিরবিদায় নিলেন অ্যানি বড়ুয়া
ছবি: সংগৃহীত

গতকাল ছিল পিইসি পরীক্ষার প্রথম দিন। পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পড়েছিল অ্যানি বড়ুয়ার। পেশায় তিনি পটিয়া উপজেলার সরকারি মেহেরআটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। নগরীর পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের বাসা থেকে স্কুলে যেতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। তাই সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি করে ঘরের কাজ গুছিয়েই স্কুলের দিকে ছুট লাগালেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর কর্মস্থলে যাওয়া হয়নি তার। বাসা থেকে কয়েক কদম যাওয়ার পরই এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের আঘাতে পথের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ে মারা যান কাজপাগল এই মানুষটি।

গতকাল রবিবার নগরীর ব্রিকফিল্ড রোডের বড়ুয়া ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অ্যানি বড়ুয়া ছাড়াও নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন আরো ছয় জন। নিহতদের মধ্যে দুটি কোমলমতি শিশুও রয়েছে। স্বজনদের অনেকেই তাত্ক্ষণিকভাবে এই করুণ মৃত্যুর কথা জানতে পারেননি। খবর পেয়ে যখন তারা এক এক করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসেন। ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। আট বছরের ছেলে আতিকুর রহমানকে নিয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছেন গৃহবধূ জুলেখা খানম ফারজানা। চিরবিদায় নিয়েছেন রংমিস্ত্রী নুরুল ইসলাম, ভ্যানচালক মো. সেলিম ও রিকশাচালক আবদুস শুকুর।

আরো পড়ুন: হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার রায় ২৭ নভেম্বর

হাসপাতালের পুলিশ বক্সের সামনে বাকরুদ্ধ অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায় অ্যানি বড়ুয়ার স্বামী প্রকৌশলী পলাশ বড়ুয়াকে। স্বামী এবং দুই ছেলে অভিষেক ও অভিজিেক নিয়ে সুখের সংসার ছিল অ্যানির। কক্সবাজারের রামু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক নীহার বড়ুয়ার মেয়ে অ্যানি। স্বামী পলাশ বড়ুয়া পটিয়ার শিকলবাহায় পিডিবির প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। বড়ো ছেলে অভিষেক এ বছর জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোটো অভিজিত্ ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। মাকে হারিয়ে কান্না থামছে না অভিষেক ও অভিজিতের। কিছুক্ষণ পর বিলাপ করতে করতে সেখানে আসেন অ্যানির বৃদ্ধা শাশুড়িসহ পরিবারের প্রায় সবাই। পলাশ বড়ুয়া জানালেন, ভালোবেসে স্ত্রীকে নতুন একটা শাড়ি কিনে দিয়েছিলাম। পিইসি পরীক্ষার প্রথম দিনের ডিউটিতে তাকে ঐ শাড়িটা পরতে বলেছিলাম। ঐ নতুন শাড়ি পরেই অ্যানি চিরবিদায় নিল। সকালে দুজনে একসঙ্গে ঘর থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ও একটু আগেই বের হয়ে যায়। আমি পরে বের হয়েই শুনি বিকট একটা আওয়াজ। তাড়াতাড়ি সেখানে গিয়ে দেখলাম অ্যানি মাটিতে পড়ে আছে। একটা বিস্ফোরণ আমার সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। আমার ছেলেরা এখন কাকে মা ডাকবে।

বিস্ফোরণের ঘটনায় স্ত্রী ফারজানা ও বড়ো ছেলে আতিকুরকে হারিয়েছেন অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছোটো ছেলে আতিফুর রহমানকে নিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালে ছুটে আসেন তিনি। আতাউর রহমান তখনো জানতেন না কত বড়ো এক দুঃসংবাদ তার জন্য অপেক্ষা করছে। পরে পুলিশ বক্সের মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে থাকা প্রিয়তমা স্ত্রী ও আদরের সন্তানের লাশ সনাক্ত করেই বিলাপ করে ওঠেন তিনি। এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে পুলিশ ও সাংবাদিকরা তাকে ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে আসেন। আতাউরের এক বন্ধু জানান, সকালে দুই ছেলেকে ভাগাভাগি করে স্কুলে পৌঁছানোর দায়িত্ব নেন আতাউর ও ফারজানা। সেই হিসেবে বড়ো ছেলের দায়িত্ব পড়ে মায়ের আর ছোটোটার দায়িত্ব বাবার। ছোটো ছেলেকে স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর দুর্ঘটনার কথা জানতে পারেন আতাউর। শুনেই ছুটে আসেন হাসপাতালে।

জরুরি বিভাগের সামনে কথা হয় বিস্ফোরণে নিহত রংমিস্ত্রী নুরুল ইসলামের ছোটো ভাই নাইমের সঙ্গে। নুরুল ইসলামের এক বছর বয়সি ছেলে মিফতা মনিও তখন চাচা নাইমের কোলে। এদিক সেদিক তাকিয়ে বাবাকেই খুঁজছিল হয়তো। নাইম জানালেন, তার ভাই প্রতিদিনের মতো গতকাল সকালেও কাজে যাচ্ছিলেন। গতকাল ছিল মিফতার জন্মদিন। তাই কাজ থেকে ফেরার সময় ছেলের জন্য উপহার আনার কথা ছিল তার। কিন্তু উপহার পাওয়া দূরে থাকুক, নিজের প্রথম জন্মদিনে বাবাকেই চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেললো মিফতা।

ইত্তেফাক/এমআরএম

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন