একমন ওজনের পিতলের গুটি খেলা দেখবে লক্ষাধিক মানুষ

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ১৩:০৩

জমিদার আমলের জমির পরিমাপের সৃষ্ট বিরোধ মিমাংসাকল্পে শক্তি পরীক্ষার বিষয়টি আজ গুটি খেলায় পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর পৌষের শেষ বিকালে পিতলের তৈরি ১ মণ ওজনের গুটি খেলা দেখতে জমায়েত হবে লক্ষাধিক মানুষ। গ্রামে গ্রামে তৈরি হচ্ছে বাহারি নিশানা।  খেলায় কোন পুরস্কার না থাকলেও ২৬৩ তম গুটি খেলার আসরকে ঘিরে সাজসাজ রব বিরাজ করছে।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার দেওখোলা ইউনিয়নের জমিদার আমলের তালুক-পরগনা সীমানার বড়ই আটা নামক স্থানে পৌষের শেষ বিকাল  ১৪ জানুয়ারি মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে খেলাটি।

আরও পড়ুন : চট্টগ্রাম- ৮ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে

সরেজমিন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নাইওরি এসেছে বাড়িতে। শিশুদের জন্য কেনা হচ্ছে জামা। ঠিকঠাক করে সুর তোলা হচ্ছে পুরনো বাদ্যযন্ত্রে। পিঠাপুলি বানানোর সমস্ত আয়োজন শেষ করছেন গৃহবধূরা। উৎসবে জবাই করা হবে যে গরু, তাও  কিনে আনা হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার পৌষের শেষ বিকালে ২৬৩ তম ঐতিহ্যবাহী গুটি খেলা হবে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার দেওখোলা ইউনিয়নের লক্ষীপুর জমিদার আমলের তালুক-পরগনা সীমানায়। এই দিনটি অনুষ্ঠানের জন্য এমনভাবে নির্ধারিত যে নতুন করে আর কোনো দিনক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না। সময়মতো লাখো মানুষের জমায়েত ঘটে চিরচেনা এই খেলার মাঠে। পিতলের তৈরি ১ মণ ওজনের গুটি করায়াত্ত করে নিজ গ্রামে নিয়ে গুম করা পর্যন্ত চলে এই খেলা। আর এই খেলাকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার গ্রামে গ্রামে চলে অন্যরকম উৎসাহ উদ্দীপনা। গোটা পরিবেশ হয়ে ওঠে আনন্দ আর উৎসবমুখর। ফুলবাড়ীয়ার লক্ষীপুর ও দশ মাইলের মাঝামাঝি বড়ই আটা বন্ধে (মাঠে) খেলার কেন্দ্রস্থল। বিকেল চারটার দিকে খেলা শুরু হয়। সকাল থেকে ফুলবাড়ীয়া ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ত্রিশাল, মুক্তাগাছা উপজেলার লোকজন আসতে থাকে লক্ষ্মীপুর বড়ই আটা বন্ধে। সড়কের অদূরে ভাটিপাড়া, বালাশ্বর, তেলিগ্রামের সংযোগস্থল নতুন সড়কে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।

জানা যায়, মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্তের সাথে ত্রিশালের বৈলরের হেম চন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে, পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশে। একই জমিদারের ভূখণ্ডে দুই নীতির প্রতিবাদে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসার জন্য লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় এই গুটি খেলার। শর্ত ছিল, গুটি যে দিকে যাবে তা হবে তালুক, পরাজিত অংশের নাম হবে পরগনা। জমিদার আমলের গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হন। তালুক পরগনার সীমান্তে জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারি খেলার গোড়াপত্তন।আমন ধান কাটা শেষ, বোরো ধান আবাদের আগে প্রজাদের শক্তি পরীক্ষার জন্য জমিদারদের এই পাতানো খেলা চলছে বছরের পর বছর ধরে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার আব্দুল খালেক জানান, গুটি খেলা ফুলবাড়ীয়া উপজেলার একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খেলা। খেলাকে ঘিরে গ্রামে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ।

গুটি সংরক্ষণকারী মোড়ল পরিবারের চঞ্চল মাহমুদ মোড়ল বলেন, আমাদের সব আয়োজন ঠিকঠাক। এখন ক্ষণ গণনা চলছে।
দেওখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান হাদী জানান, এ অঞ্চলে একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলা। আর গ্রামে এখন আগের মতো খেলাধূলা না থাকায় গুটি খেলায় লাখো দর্শকের সমাগম হয়।

ইত্তেফাক/এমআরএম