মৌলভীবাজারের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আজিজুর রহমান আর নেই

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২০, ১৩:২৯

মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান,বীর মুক্তিযোদ্ধা, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর আলহাজ্ব আজিজুর রহমান করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্নালিল্লাহি রাজিউন)।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার ভোররাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
করোনা আক্রান্ত হয়ে গত ৫ আগস্ট তিনি বিএসএমএমইউ-তে ভর্তি হন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে মৌলভীবাজার থেকে নেওয়া হয় ঢাকায়।

আজিজুর রহমান ছিলেন সাবেক গণপরিষদ সদস্য, দুইবার সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক হুইপ, বাংলাদেশ সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামীলীগ এর সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, মহান স্বাধীনতা পদকে ভূষিত বীর মুক্তিযোদ্ধা। 

সর্বশেষ মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি মৌলভীবাজার ইউনিট এর চেয়ারম্যান সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, ৫ আগস্ট বুধবার বিকেলে বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদের শরীরে করোনা পজিটিভ ধরা পরে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য বুধবার রাত ১২টা ২ মিনিটে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মৌলভীবাজার রাডার ইউনিট থেকে করোনা রোগীবাহী এয়ার এ্যাম্বুলেন্স করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বিমান বাহিনীর মৌলভীবাজার রাডার ইউনিট পর্যন্ত বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদকে উন্নত চিকিৎসায় এগিয়ে দিতে যান জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মোঃ ফজলুর রহমান সহ অন্যান্যরা।

জেলা প্রশাসনের সূত্র  জানায়, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশে তড়িৎ ব্যবস্থাপনায়, বিমান বাহিনীর সহযোগিতায় ও জেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত আজিজুর রহমানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।

আজিজুর রহমান একজন সাংস্কৃতিক ও নাট্যকর্মী থেকে নিজের সততা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতায় হয়ে উঠেন দেশ-মাটি ও গণমানুষের নেতা। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও ৪নং সেক্টরের মুক্তিযুদ্ধ কালীন মৌলভীবাজার জেলা রাজনৈতিক সমন্বয়কারী ছিলেন।

আজিজুর রহমান ১৯৪৩ সালে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের গুজারাই গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। শুধু মুক্তিযোদ্ধা নয় তিনি একাধিক বার পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাও।

আজিজুর রহমান ১৯৫৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৬২ সালে মৌলভীবাজার কলেজ থেকে আইকম পাশ করেন এবং হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজ থেকে বি-কম পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম কম করেন।

তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সংসদে তিনি সবচেয়ে কম বয়সী ও কনিষ্ঠ এমপি ছিলেন। এরপর ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে টানা ২ বার মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন নিয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। একবার জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় হুইপ ও একবার কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন।

বর্তমান রুগ্ন রাজনীতি, পেশিশক্তি নির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার এক অনুকরণীয় নাম আজিজুর রহমান।  তিনি সততা, অসাম্প্রদায়িকতা ও অহিংস রাজনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মৌলভীবাজার জেলায়।

রাষ্ট্র ও সরকারের এবং দলের এতসব গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকেও দেশ ও সাধারণ গরীব দুঃখী মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন। এতসব গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পরও কোন দিন ব্যক্তিগত স্টাফ, গ্যানম্যান রাখেননি। সরকারি সুযোগ সুবিধাও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেননি।

আজিজুর রহমান মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সরকারি কাজ ছাড়া সরকারের দেয়া গাড়ি অফিস সময়ের পর ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। তিনি আজন্ম প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক অহিংস রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক মনা একজন মানুষ ছিলেন।

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগ, জেলা যুবলীগ ও জেলা আওয়ামীলীগে সভাপতি সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদে সফলতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

আজিজুর রহমান, যে কোন দুর্যোগে মানুষের পাশে থেকে সহায়তা ও সাহস যুগিয়েছেন। সর্বশেষ করোনা মহামারি সহ ঝড়বৃষ্টি বন্যা,নদী ভাঙ্গনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাত দিন মানুষের সহায়তার কাজ করা একজন সাদা মনের মানুষ। এর আগে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব সফলতা ও সততার সঙ্গে পালন করেন।

ইত্তেফাক/এমআরএম