সৌদি আরবে নির্যাতন সইতে না পেরে দেশে চলে আসে মুক্তা

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ২৩:৩০

পেটের দায়ে সৌদি আরব গেলেও নির্যাতন সইতে না পেরে নয় মাস পর বাংলাদেশে চলে আসে কিশোরী মুক্তা আক্তার। তার সমস্ত শরীরে সৌদি কফিলের নির্যাতনের ক্ষত চিহ্ন রয়েছে। মুক্তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।  

মুক্তা আক্তার বিজয়নগর উপজেলার হরষপুর ইউনিয়নের নিদারাবাদ গ্রামের মুখলেছ মিয়ার দ্বিতীয় মেয়ে। মুক্তা নিদারাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। তার বাবা মুখলেছ হরষপুর ইউনিয়ন কৃষকলীগের প্রচার সম্পাদক। মুক্তাসহ মুখলেছের পাঁচ মেয়ে ও একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। 

মুক্তার বাম ও ডান হাতের কব্জিতে কাটার ক্ষত চিহ্ন, দুই পায়ে এসিডে পোড়ানো কালো ক্ষতের চিহ্ন। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর জায়গায়ও ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে।

সৌদি আরবে মালিকের বাড়িতে কাজ করতে একটু দেরি হলেই কফিল মোহাম্মদ, তার স্ত্রী ও সন্তানেরা তাকে মারধর করত। ফ্রিজের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দিত। দেয়ালের মধ্যে মাথাকে ধাক্কা দিত। এভাবেই সৌদি আরব থেকে ফেরত এই কিশোরী নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অত্যাচারের কথাগুলো কান্নারত অবস্থায় বলছিল।

গত শনিবার বেলা ১২টার দিকে ঢাকা বিমানবন্দরে বিমান থেকে নামে এই কিশোরী। রাত ১০টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতলে চিকিৎসার জন্য আসে কিশোরী মেয়েটি।

কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল সৌদির আরবে গিয়েছিল মুক্তা। পাশ্ববর্তী হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার আদম ব্যবসায়ী আক্তার মিয়া সৌদি আরবে হাসপাতালের কাজে ভিসার প্রলোভন দেখিয়েছিল তাদের বাবা মুখলেছকে। টাকার পরিমান স্বল্প হওয়ায় মুখলেছ তার মেয়ে মুক্তাকে ৭০ হাজার টাকায় সৌদি আরবে পাঠাতে রাজি হন। অবশ্য দালাল আক্তারের সঙ্গে মুখলেছ ২৫০ টাকার তিনটি স্ট্যাম্পে চুক্তিও করেন। কিন্তু সেখানে হাসপাতালের কাজের পরিবর্তে কফিলের বাড়িতে কাজের মেয়ের কাজ পায় মুক্তা। গত শনিবার মুক্তা দেশে আসে। 

শারিরীক নির্যাতনের শিকার মুক্তা আক্তার বলে, 'আমার কফিলের নাম মোহাম্মদ। কফিল থাকতো জেদ্দায়। আমি থাকতাম আবহাতে। কফিলের বাড়ির সবাই আমাকে মারতো। তাদের আঙ্গুরের বাগানেও কাজ করতে হয়েছে।'

মুক্তা বলে, 'একদিন কফিল আমাকে চা বানাতে বলেছিল। একইসঙ্গে কফিলের স্ত্রী পিঁয়াজ ছিলতে বলেছিল। চা বানাতে গিয়ে পিঁয়াজ ছিলতে দেরি হয়। কেন দেরি হলো এজন্য কফিলের স্ত্রী আমাকে ডেকে রান্না ঘরে নিয়ে যায়। আমার হাত তার সামনে রাখতে বলে। রাখতেই আমার বাম হাতের কব্জি বরাবর ছুরি দিয়ে পোচ দেয়। একই সঙ্গে ডান হাতে।' বলতে বলতে মুক্তা কান্নায় ভেঙে পড়ে! মুক্তার দুই হাতের কব্জিতে কলো ক্ষতের দাগ রয়েছে। 

মুক্তা বলে, ‘এর জেরে দুই দিন ফ্রিজের মধ্যে কয়েক মিনিট আমার মাথা ঢুকাইয়া রাখছে। জুতা দিয়া পিটাইছে। ওয়ালের মইধ্যে আমার মাথা পট মারছে।’ 

মুক্তা এসময় কাঁদছিল আর বলছিল, 'কাজ না করলেই তারা মারতো। দুই পায়ের হাঁটুর নিচে এসিড দিছে অনেক বার।'
 
মুক্তা আরো বলে, 'এসব কাজের বিষয়ে দালালকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই কাজ কেন পেলাম? সে বলেছে মা কপালে নাই কা। আমি ভাবলাম গরীবের সন্তান  কি করব!'

মুক্তা বলে, 'এসব অত্যাচারের কথা আমি বাবাকে বলেছিলাম। বলেছিলাম, যদি জীবীত দেখতে চাও নিয়ে যাও। আমি পালাতে পারতাম। কিন্তু পালিয়ে যাবো কোথায়? পাসপোর্ট মালিকের বাবা মো. আলীর কাছে ছিল।'

আরও পড়ুনঃ নন্দীগ্রামে ডিবি পরিচয়ে ছিনতাইকালে গ্রেফতার ৫

মুক্তার বাবা মুখলেছ মিয়া জানান, 'ছোট মেয়েটা মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে পারেনি। পরে দালালকে টাকা দিয়ে মেয়েকে দেশে আনার ব্যবস্থা করেছিলাম। পরে মুক্তাও এসব অত্যাচারের কথা বলছে। পরে দালাল আক্তারকে আরো ২০হাজার টাকা দিছি।'

ইত্তেফাক/নূহু