ধর্ষণে অভিযুক্তকে বাঁচাতে পুলিশ-চিকিৎসকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২০, ১৬:৫৯

রাজশাহীতে এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের মামলার দায় থেকে গ্রেফতার অভিযুক্তকে বাঁচাতে পুলিশ ও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ মামলার এজাহারে ধর্ষণের ঘটনার তারিখ ৫ আগস্টের পরিবর্তে ১২ জানুয়ারি এবং চিকিৎসক ধর্ষণের আলামত পরীক্ষার তারিখ ৯ আগস্টের পরিবর্তে ২৬ আগস্ট লিপিবদ্ধ করেছে বলে ভিকটিম ও তার আইনজীবী অভিযোগ করেছেন। 

এদিকে মামলার এজাহার ও মেডিক্যাল পরীক্ষার প্রতিবেদনে তারিখ জালিয়াতির কারণে ধর্ষণের শিকার ছাত্রী সঠিক বিচার না পাওয়ার আশঙ্কার রয়েছেন। ন্যায় বিচারের আশায় দিশেহারা ওই ছাত্রী আদালত ও আইনজীবীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

ধর্ষণের শিকার কলেজছাত্রীর অভিযোগ, গত ৫ আগস্ট ধর্ষণের পরের দিন তিনি নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় গিয়ে তার অভিযুক্ত প্রেমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ কামরুজ্জামান দুলালের ছেলে ব্যবসায়ী ও প্রেমিক মনিরুজ্জামান মান্নাকে গ্রেফতার করে।

এরপর অভিযুক্ত মান্নার পরিবার মেয়েটিকে সমঝোতার জন্য বার বার চাপ প্রয়োগ করে। এক পর্যায়ে লক্ষ টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি মীমাংসা করতেও বলে ছাত্রীকে। কিন্তু জানিয়ে দেয়, অভিযুক্ত মান্না তাকে বিয়ে করলেই কেবল তিনি সমঝোতা করবেন। কিন্তু মান্না বিয়েতে রাজি হয় নি। পরে একটি সাদা কাগজে ভিকটিমের স্বাক্ষর নিয়ে পুলিশ ভিকটিমকে মেডিক্যাল টেস্টের জন্য গত ৯ আগস্ট রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) পাঠায়।

মামলায় উল্লেখ করা হয়, নগরীর বেলদারপাড়া এলাকায় অভিযুক্ত মান্নার এক বন্ধুর বাড়িতে ভিকটিম কলেজছাত্রী ধর্ষণের শিকার হন। ওইদিন বিয়ের প্রলোভনে মনিরুজ্জামান মান্না তাকে ধর্ষণ করে। কিন্তু ধর্ষণের পরে মেয়েটিকে মান্না আর বিয়ে করতে রাজি হন নি। পরে ভিকটিম অভিযুক্ত মান্নার বোনের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। কিন্তু মান্নার বোন তার কাছে ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এরপর তাকে মেয়েটিকে মান্নার বোন মোছা. শিলা মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে ভিকটিম গত ৬ আগস্ট নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় গিয়ে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন।

ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীর অভিযোগ, ঘটনার তারিখ ৫ আগস্ট উল্লেখ করার পরেই পুলিশ তাকে ধর্ষণের আলামত পরীক্ষার জন্য রামেক হাসপাতালের ওসিসিতে পাঠায়। কিন্তু পুলিশ ভিকটিমের অনুপস্থিতিতে মামলার এজাহারে ঘটনার তারিখ পরিবর্তন করে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি উল্লেখ করেছে। তিনি আরও জানান, ধর্ষণের একদিনের পরেই থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছি। তার মৌখিক অভিযোগ পেয়েই পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু প্রভাবশালী আসামিকে বাঁচাতে পুলিশ এজাহারে ধর্ষণের ঘটনার তারিখ এবং চিকিৎসক ধর্ষণের আলামত সংগ্রহের তারিখ পরিবর্তন করে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে। তিনি এসব ঘটনায় জাড়িতদের বিচার চান।

ওই ছাত্রীর আইনজীবী হামিদুল হক বলেন, মেয়েটি যদি ৭ মাস আগে ধর্ষিত হতো, তাহলে থানা মামলা নিয়ে ধর্ষণের আলামত পরীক্ষার জন্য পাঠাতো না। কারণ এতোদিনে ধর্ষণের কোনো আলামত থাকার কথা নয়। মেয়েটি গত ৫ আগস্টেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কিন্তু পুলিশ ইচ্ছেকৃতভাবে আসামিকে বাঁচাতে এজাহারে সেই তারিখ পরিবর্তন করে সেখানে ১২ জানুয়ারির কথা উল্লেখ করেছে। 

তিনি আরও জানান, মামলার এজাহারে যে তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে, ওইদিন আসামি মালেয়শিয়ায় ছিলেন। এ ধরণের একটি পাসপোর্ট ও ভিসার কপিও আসামিপক্ষে আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, পুলিশ মামলার তারিখ পরিবর্তন করেছে ধর্ষককে বাঁচানোর জন্যই। অন্যদিকে রামেক হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকও তার প্রতিবেদন তৈরির দিন ইচ্ছেকৃতভাবে ৯ আগস্টের স্থলে ২৬ জুলাই উল্লেখ করেছেন। অথচ থানায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে ৬ আগস্ট। এরপর ৮ আগস্ট মামলার আইও পুলিশের এসআই রওশন আলম চিঠি দিয়ে ভিকটিমের ধর্ষণের আলামত পরীক্ষার জন্য মেয়েটিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু পরের দিন ৯ আগস্ট মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ।

আরও পড়ুন: জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে চাচাতো ভাইদের ইটের আঘাতে নিহত ১

আইনজীবী প্রশ্ন করেন, থানায় মামলা হওয়ার আগেই ওই চিকিৎসক মেয়েটির ধর্ষণের আলামত পরীক্ষা করলেন কিভাবে? পুলিশ ও চিকিৎসক পরস্পর যোগসাজশ করে মেয়েটিকে এই ধর্ষণের বিচার না পাওয়ার জন্যই এমন জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। আমি চাই এমন জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হউক। ধর্ষণ প্রতিবেদনেও মেয়েটি সরাসরি ধর্ষণের শিকার হয়েছে সেটি উল্লেখ করা হয়নি। কোনো এক সময় মেয়েটির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক হয়েছে এমন কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যৌন সম্পর্ক হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসি নিবারণ চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘মামলায় তারিখ পরিবর্তনের ঘটনাটি সঠিক নয়। আসামিকে বাঁচাতে তারিখ পরিবর্তনের অভিযোগও সঠিক নয়। বাদীর দেওয়া তথ্য মতেই মামলা এজাহারভূক্ত করা হয়েছে। কোনো বাড়তি তথ্য দেওয়া হয়নি।’

অন্যদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মো. কফিল উদ্দিন বলেন, ‘আলামত সংগ্রহের তারিখ ভুলবশত ২৬ জুলাই হয়েছে। সেটি সংশোধন করা যাবে। কিন্তু আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রতিবেদন তৈরির বিষয়টি সঠিক নয়।’ 

ইত্তেফাক/এএএম