ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। সবার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে ৩০৩ আসনে একাই জয় পেয়েছে দলটি। আর বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৩৫০টি আসন। অন্যদিকে প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৫২টি আসন। আর ইউপিএ জোট পেয়েছে ৮২টি আসন। ভারতের ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একটি আসনও পায়নি কংগ্রেস। নির্বাচনে এই ভরাডুবির পর চরমভাবে চাপের মুখে পড়েছে কংগ্রেস নেতৃত্ব। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরদিন কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতাদের পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে।
গতকাল শুক্রবার উত্তরপ্রদেশের সভাপতি রাজ বাব্বরসহ তিন রাজ্যের দলীয় প্রধানরা কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর কাছে তাদের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। আজ শনিবার কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে রাহুল নিজেও পদত্যাগের ঘোষণা দিতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। এই নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর কংগ্রেসে নেহরু-গান্ধী পরিবারের নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়তে শুরু করেছে।
এদিকে ১৯৮৪ সালের পর লোকসভা নির্বাচনে পরপর দুইবার সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভের কৃতিত্ব দেখিয়েছে বিজেপি। তবে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পর প্রতিবারের মতো বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকারই হচ্ছে। বিপুল জয়ের পর মোদির মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত চার থেকে পাঁচজন এমপির। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, আগামী ২৯ মে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ এই শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য ইতোমধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নিতে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন নরেন্দ্র মোদি। গতকাল শুক্রবার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন তিনি। এ সময় তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। রাষ্ট্রপতি মোদি ও মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন।
কংগ্রেসে পদত্যাগের হিড়িক
উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেস সভাপতি রাজ বাব্বর নিজের আসনে তো হেরেছেনই, সার্বিকভাবে ওই রাজ্যে দলেরও ভরাডুবি হয়েছে। ৮০টির মধ্যে কংগ্রেস মাত্র একটি আসনে জিতেছে। এই হতাশাজনক ফলের দায় নিয়ে দলের সভাপতি রাহুল গান্ধীর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বাব্বর।
টুইট করে তিনি বলেছেন, উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের এই ফল অত্যন্ত হতাশাজনক। আমি সঠিকভাবে আমার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। দলীয় নেতৃত্বকে আমি আমার বক্তব্য জানাবো।
ওড়িশা এবং কর্নাটকেও ভরাডুবি হয়েছে কংগ্রেসের। এখনো কর্নাটকে রাজ্য সরকার চালাচ্ছে কংগ্রেস-জেডিএস জোট। এরপরও লোকসভা নির্বাচনে সেখানে ভরাডুবি হওয়ায় কর্নাটকের কংগ্রেসের প্রচারণা কমিটির প্রধান এইচ কে পাতিল পদত্যাগ করেছেন। ওড়িশায় ২১টি আসনের মধ্যে মাত্র একটিতে জয় পেয়েছে কংগ্রেস। নবীন পট্টনায়েকের বিজেডির দাপটে কংগ্রেস এবং বিজেপি ওড়িশায় কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ওই রাজ্যের কংগ্রেস সভাপতি নীরাঞ্জন পট্টনায়েকও পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন।
জানা যাচ্ছে, কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীও পদত্যাগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বৃহস্পতিবার নির্বাচনের ভোট গণনা চলাকালে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রাহুল জানান, দলের কার্যনির্বাহী কমিটি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। এটি কার্যনির্বাহী কমিটি এবং তাঁর বিষয়। তবে কয়েকটি ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, রাহুল গান্ধীর মা সোনিয়া গান্ধী এই প্রস্তাবে সায় দেননি। তারপরও আজ শনিবার কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় বিষয়টি উত্থাপিত হতে পারে। প্রসঙ্গত, গান্ধী পরিবারের দুর্গ হিসেবে পরিচিত আমেথিতে এবার হেরেছেন রাহুল গান্ধী। যদিও কেরালার ওয়েনাড আসনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন তিনি।
একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জোট সরকার গড়বে বিজেপি
এ মাসের মধ্যে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা কেমন হবে তা নিয়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে। জানা গেছে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও বিজেপির নেতৃত্বে আবারো জোট সরকারই হবে ভারতে।
২০১৪ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল বিজেপি। তখন ৪১ দলীয় জোট ছিল এনডিএর। সেই জোট পেয়েছিল ৩৩৬ আসন। আর বিজেপি একাই পেয়েছিল ২৮২। সরকার গড়তে প্রয়োজন ছিল ২৭২ আসনের। সেবার মোদির ৮২ সদস্যের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন শরিক দলের ৭ জন। এবারো মোদির নেতৃত্বে যে বিজেপি সরকার গঠন হবে সেখানে ঠাঁই পেতে পারেন শরিকদের কয়েক জন।
২০১৪ সালে মোদির মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছিলেন বিহারের লোক জনশক্তি পার্টির প্রধান রামবিলাস পাসওয়ান। তিনি হন গণবণ্টন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। অন্ধ্র প্রদেশের তেলেগু দেশম পার্টির নেতা অশোক গজপতি রাজু পশুপতি হন বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী। পরে তার দল জোট ছাড়ায় মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন তিনি। শিবসেনার অনন্ত গিতে হন ভারী শিল্প দপ্তরের মন্ত্রী। পাঞ্জাবের শিরোমণি আকালি দলের হরসিমরত কউর বাদল পান খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
এছাড়াও মহারাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টি অফ ইন্ডিয়ার রামদাস আটওয়ালে পেয়েছিলেন সামাজিক ন্যায় এবং উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। তাঁর দল পেয়েছিল মাত্র একটি আসন। রাষ্ট্রীয় লোক সমতা পার্টির উপেন্দ্র কুশাওহা পেয়েছিলেন মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। উত্তরপ্রদেশের আপনা দলের অনুপ্রিয়া প্যাটেল হন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। পরবর্তীতে বিহারের জনতা দল (?ইউনাইটেড)? এনডিএতে যোগ দেয়। তাদের ২ জন মন্ত্রী হন।
এবারও বিহারের জনতা দল (?ইউনাইটেড) এবং লোক জনশক্তি পার্টি, মহারাষ্ট্রের শিবসেনা, উত্তরপ্রদেশের আপনা দল, পাঞ্জাবের শিরোমণি আকালি দল থেকে কয়েকজন জোট সরকারের মন্ত্রী হতে পারেন। প্রথম দফায় না হলেও কয়েক মাসের মধ্যে ফের একবার মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে আরো কয়েকটি দলের নেতারা ঠাঁই পেতে পারেন।
সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন রামবিলাশ পাসওয়ান, অনন্ত গিতে, অনুপ্রিয়া প্যাটেলসহ আরও কয়েকজন। নতুন করে এনডিএতে যোগ দিয়েছে তামিলনাডুর এআইডিএমকে। তাদের একজন এমপি হয়েছেন। তিনিও এই মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন।
বিজেপি সূত্রে জানা গেছে, লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে বিল পাশ করাতে শরিকদের সহায়তা দরকার। এ ছাড়া বিজেপি মনে করে জোট করেই সাফল্য পেয়েছে এনডিএ। তাই শরিকরাও মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবেন।
বিজেপির এক নেতা জানিয়েছেন, ১৯৯৮ সালে এনডিএ গঠিত হয়েছে। তখন থেকেই ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক দল আমাদের শরিক। অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে এনডিএ সরকার গঠনে তারা সহায়তা করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৪ থেকে ২০১৪ যখন আমরা ক্ষমতা ছিলাম না তখনও তারা আমাদের পাশে ছিলেন। এখনো রয়েছেন। ফলে মন্ত্রিসভায় তাদের যথেষ্টই গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকজন ঠাঁই পেতে পারেন মন্ত্রিসভায়
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ওপর চাপ বাড়াতে পশ্চিমবঙ্গে মন্ত্রীর সংখ্যা বাড়াতে পারে বিজেপি। এবারের নির্বাচনে ১৮টি আসনে জিতেছে বিজেপি। এই প্রথমবার তারা পশ্চিমবঙ্গে এত আসন পেয়েছে। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন পশ্চিমবঙ্গের ৪ থেকে ৫ জন বিজেপি এমপি। এর আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বাবুল সুপ্রিয় এবং এসএস আলুওয়ালিয়া।
এদিকে জয়ী-পরাজিত সব প্রার্থীকে নিয়ে আজ বৈঠকে বসছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। আজ তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারেন বলেও জানা গেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অভাবনীয় সাফল্যে বাপকভাবে হতাশ হয়েছেন মমতা ব্যানার্জি।
ইত্তেফাক/এসআর

