আল্লাহ তাআলার অশেষ করুণা-যখন কোনো মুমিন বান্দা পাপ করে, তখন সেই গুনাহ তাৎক্ষণিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় না। হাদিসে এসেছে, পাপ করার পর ফেরেশতারা প্রায় ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কেন? যাতে বান্দা অনুতপ্ত হয়ে তওবা ও ইস্তেগফার করার সময় পায়।
আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত, নিশ্চয়ই বাম পাশে থাকা ফেরেশতা (যিনি গুনাহ লেখেন) মুসলিম বান্দা যখন ভুল করে বসে, তখন ছয় ঘণ্টা কলম থামিয়ে রাখেন। যদি বান্দা এই সময়ের মধ্যে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাহলে সেই গুনাহ লেখা হয় না। আর যদি ক্ষমা না চায়, তখন একটি গুনাহ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। (সহিহুল জামে: ২০৯৭)
পবিত্র কোরআনের বেশ কিছু আয়াতে এই ক্ষমার বাণী স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সুরা আত-তাওবার ১০৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তার বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং তাদের সদকা গ্রহণ করেন? নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
একইভাবে সুরা আজ-জুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি তো পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
মৃত্যু কখন আমাদের কড়া নাড়বে, তা কেউ জানে না। তাই তওবা করতে দেরি করা মোটেও উচিত নয়, এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। মৃত্যুর যন্ত্রণা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তওবার দরজা সবার জন্য খোলা থাকে।
এ প্রসঙ্গে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ বান্দার তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠাগত হয়। (সুনানে তিরমিজি)
যেহেতু আমাদের জানা নেই কখন মৃত্যু আসবে, তাই তাওবা করার ক্ষেত্রে অলসতা বা অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।
ইসলামের দৃষ্টিতে তওবা কবুল হওয়ার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত বা ধাপ রয়েছে, যা পূরণ করা জরুরি:
১. অতীতে করা গুনাহের জন্য মনের ভেতর গভীর অনুশোচনা ও লজ্জা থাকতে হবে।
২. সেই গুনাহের কাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে এবং যেসব পরিবেশ বা কারণে সেই পাপ সংঘটিত হয়েছিল, তা পুরোপুরি বর্জন করতে হবে।
৩. ভবিষ্যতে আর কখনো সেই পাপে লিপ্ত না হওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে। সেই সঙ্গে অতীতের পাপ ধুয়ে মুছে ফেলতে বেশি বেশি নেক আমলে মশগুল হতে হবে।
এই শর্তগুলো মূলত আল্লাহর হকের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুনাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে অপরাধ যদি কোনো মানুষের অধিকার বা বান্দার হকের সঙ্গে জড়িত হয়, তাহলে যার ক্ষতি করা হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া, ক্ষতিপূরণ দেওয়া বা তার পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া তওবা কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।
সঠিক নিয়মে তওবা করতে পারলে তা মানুষের পেছনের সব গুনাহ মুছে দেয় এবং আমলনামা একদম পরিষ্কার করে দেয়। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পাপাচার থেকে খাঁটি মনে তওবাকারী ব্যক্তি সেই মানুষের মতো, যার কোনো গুনাহই নেই। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
সুতরাং, গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর হতাশায় নিমজ্জিত হওয়া কোনো সমাধান নয় বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
সতর্কবার্তা সুযোগকে অবহেলা নয়
এই ছয় ঘণ্টার অবকাশ যেন আমাদের গাফিলতির কারণ না হয়। এটি পাপের সুযোগ নয়, বরং তওবার সুযোগ। কারণ, মৃত্যুর সময় সম্পর্কে কেউ জানে না। আল্লাহ আমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। তিনি চান, আমরা তার কাছে ফিরে আসি, ক্ষমা চাই, এবং গুনাহ থেকে মুক্ত হই। اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَتُبْ عَلَيْنَا، إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ হে আল্লাহ! আমাদের ক্ষমা করুন, আমাদের প্রতি রহম করুন, আমাদের তওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তওবার তাওফিক দান করুন। আমিন।

