রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় নিজভূমিতে প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৯, ০০:৫৪

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমারের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের নিজভূমিতে স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়াই সংকটের একমাত্র সমাধান। এই সংকট কেবল বাংলাদেশে নয়, এর বাইরেও অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল বিকালে আজারবাইজানের বাকু কংগ্রেস সেন্টারে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে সমসাময়িক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত ও পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিশ্চিতে ‘বান্দুং নীতিমালা’ সমুন্নত রাখা বিষয়ে এক সাধারণ আলোচনায় ভাষণে একথা বলেন।

আর্থসামাজিক সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশ বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকট এই দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট একটি রাজনৈতিক সংকট এবং এর মূল গভীরভাবে মিয়ানমারে প্রোথিত। তাই এর সমাধানও মিয়ানমারের অভ্যন্তরেই খুঁজতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছি। এটির আমাদের দেশ এবং এর বাইরেও অস্থিতিশীলতা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা এই সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা কামনা করছি।’ এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১ কোটির বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে ভারত আশ্রয় দেওয়ার কথা স্মরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার পর বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় তিনি এবং তার ছোটো বোন শেখ রেহানাকে ছয় বছর নির্বাসনে কাটাতে হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দায় খুবই নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোকে তাই অবশ্যই জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানাতে হবে।

রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের বিচার

দাবি মাহাথিরের

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের বিচার দাবি করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ বলেছেন, এ সমস্যা সমাধানে যা প্রয়োজন মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলো তার সবকিছুই করবে।

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে এবং এর বিচার হতে হবে।’ ১৮তম ন্যাম সম্মেলনের সাইড লাইনে বিকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মাহাথির এই দাবি করেন।

বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

ড. মাহাথির বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, মালয়েশিয়া কক্সবাজারে তার হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে এবং ভাসানচরের যে দ্বীপে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা হবে, সে সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান। শেখ হাসিনা, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে দ্বীপটির নিরাপত্তা এবং সুরক্ষাসহ বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত করেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার আরো বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগে কাজ অব্যাহত রাখবে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে

কাজ করে যাবে তেহরান

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, তেহরান রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে কাজ করে যাবে। বাকু কংগ্রেস সেন্টারে ১৮তম ন্যাম সম্মেলনের সাইড লাইনে বিকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে ইরানের প্রেসিডেন্ট এই আশ্বাস দেন। বৈঠকের পরে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। রুহানি প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান করায় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

এর আগে ফোরামের চেতনা সমুন্নত রাখা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বানের মধ্য দিয়ে গতকাল শুক্রবার আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) ১৮তম সম্মেলন শুরু হয়। বাকু কংগ্রেস সেন্টারে ১২০টি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ফোরাম ন্যাম’র দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম এলিয়েভ।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্য সদস্য দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাকু কংগ্রেস সেন্টারের প্ল্যানারি হলে সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ১০টায় সম্মেলন স্থলে এসে পৌঁছলে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট তাকে স্বাগত জানান।

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট এবং ন্যামের বর্তমান চেয়ারপার্সন নিকোলাস মাদুরো সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত ভাষণ দেন। তার ভাষণের পরই আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম এলিয়েভ সর্বসম্মতিক্রমে আগামী তিন বছরের জন্য ন্যাম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরই প্রদত্ত ভাষণে তিনি ন্যাম’কে বাংডুং আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনের সভাপতি তিজানি মুহাম্মাদ-বান্দে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

 

‘আলজেরিয়া পুনরায়

ঢাকায় মিশন খুলবে’

বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে আলজেরিয়া ঢাকায় তার কূটনৈতিক মিশন পুনরায় চালু করবে। আলজেরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট আবদেলকাদের বেনসালাহ বিকালে বাকু কংগ্রেস সেন্টারে ন্যাম সম্মেলনের সাইড লাইনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে এ কথা বলেন। বাংলাদেশে মিশন পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী আলজেরীয় প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তার সরকার এ বিষয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। শেখ হাসিনা ন্যাম সম্মেলনে যোগদান উপলক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আলজেরিয়া সফর এবং একই সঙ্গে তার নিজের আলজেরিয়া সফরের কথাও স্মরণ করেন।