বিটিভি রিভিউ

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:৪২

 তারেকুর রহমান

 

কিছুদিন আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতে বিটিভির সম্প্রচার শুরু হয়। এই কদিনে ভারতীয় দর্শকদের মনে বিটিভি কী রূপ সাড়া পড়েছে, তা উঠে এসেছে ভারতীয় এক দর্শকের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। সেই (কাল্পনিক) প্রতিক্রিয়া ঠাট্টার পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো

 

অনেকদিন থেকে ভারতে বাংলাদেশি চ্যানেল চালু হবে শুনে আসছি। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই তো কিছুদিন আগ থেকে শুনছি ভারতের জনগণ আনুষ্ঠানিকভাবে বিটিভি দেখতে পারবে। এ নিয়ে আমার ঠাম্মা, মাসি, পিসি ওদের আনন্দের শেষ নেই। জীবনের বড় একটা সময় তারা বাংলাদেশে কাটিয়েছে। তখন নাকি বাংলাদেশে বিটিভি ছাড়া কোনো চ্যানেল ছিল না। অবশ্য এখন নাকি বাংলাদেশে অনেক চ্যানেল। চ্যানেল সংখ্যা কত, আমার জানা নেই। অবশ্য অন্য চ্যানেল নিয়ে আমার বা আমাদের অত আগ্রহ নেই। বিটিভি নিয়েই যত আগ্রহ। এই তো সেদিন পিসি বিটিভির কথা বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেললেন। অনেক স্মৃতি রোমান্থন করলেন। কখন যে আমারও চোখে জল জমা হলো টেরই পাইনি।

অবশেষে ভারতের জনগণের বিটিভি দেখার সুযোগ হলো। সকাল সকাল চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে বিটিভির দেখা পেলাম। টিভি অন করেই যে অনুষ্ঠানটা দেখলাম সেটার নাম ‘বাংলার কৃষি’। প্রায় প্রতিদিন সকালেই এই অনুষ্ঠানটা দেখি। বাংলাদেশি মানুষ বেশিরভাগই কৃষির ওপর নির্ভরশীল, তাই হয়তো এ অনুষ্ঠান দিয়েই দিনের যাত্রা শুরু হয়। অনুষ্ঠানটা দেখতে বেশ ভালোই লাগল। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে কার না ভালো লাগে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আমার ঠাম্মা, মাসি, পিসি মা বোন সবাই বিটিভি দেখতে বসে পড়ল। তারা তাদের স্মৃতি রোমান্থন করছে আর আমি অভিজ্ঞতা নেওয়ার চেষ্টা করছি। বিটিভিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি গানের অনুষ্ঠান হয়। আমাদের দেশ এদিক দিয়ে পিছিয়ে। এত পরিমাণ গান আমাদের দেশের কোনো চ্যানেলে দেখায় না। এই যেমন নজরুলসংগীতের একটা অনুষ্ঠানের নাম ‘দোলনচাঁপা’, আবার নজরুলসংগীতের আরেকটা অনুষ্ঠানের নাম ‘সন্ধ্যামালতি’। আবার রবীন্দ্রসংগীতের একটা অনুষ্ঠানের নাম ‘গীতিমাল্য’, আবার আরেকটা অনুষ্ঠানের নাম ‘গীতবিতান’। দুজন প্রধান কবির গানকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের জন্য ভিন্ন নামে সাজানো হয়েছে। আমাদের দেশে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে এতগুলো অনুষ্ঠান হয় না। এ অনুষ্ঠানগুলো দেখতে একটুও একঘেয়েমি লাগেনি। এ কদিনে এ অনুষ্ঠানগুলো আমার বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছে। নানা ধরনের গানের অনুষ্ঠান নিয়মিত প্রচারিত হয় বিটিভিতে। একটা দেখলাম ‘ভৈরবী’ গানের অনুষ্ঠান, আবার দেখলাম ‘স্মৃতিময় গান’ নামের অনুষ্ঠান। কী অসাধারণ গায়কী, কী অসাধারণ উপস্থাপনা! মুগ্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। এই তো সেদিন দুপুরে একটা অনুষ্ঠান দেখলাম নতুন শিল্পীদের অংশগ্রহণের অনুষ্ঠান ‘নবজাগরণ’। নতুনদের তুলে আনার জন্য একটা সরকারি টেলিভিশনের এরকম কর্মকাণ্ড এক ধরনের মাইলফলক। আধুনিক গানের অনুষ্ঠান ‘মালঞ্চ’ দেখে তো আমার পিসি কান্না শুরু করল। তাদের সময়ও নাকি এ অনুষ্ঠানগুলো হতো। তারা অবাক হয়ে গেছে, এমনকি আমিও অবাক হয়ে গেছি, এত বছরেও বিটিভি একটুও পরিবর্তিত হয়নি। সেই কয়েক যুগ আগেও নাকি এ অনুষ্ঠানগুলো হতো, এখনো বহাল তবিয়তে বিদ্যমান রয়েছে। লোকসংগীতের অনুষ্ঠান ‘অচিন মানুষ’ দেখে খুব ভালো লাগল। গান যাই হোক না কেন, বাঙালির যে একটা ভালো সংস্কৃতি আছে, তা এ অনুষ্ঠানগুলো দেখলে অনুমান করা যায়। ‘বাঁশরী’, ‘শতরূপা’, ‘শিউলিমালা’ নামেরও গানের অনুষ্ঠান রয়েছে। বিটিভি গানকে নানা আঙ্গিকে এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে যে, তা দেশে কিংবা বিদেশের সবার মন কাড়বে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের একটা অনুষ্ঠান হয়, কী যেন নাম ঠিক মনে করতে পারছি না। এ অনুষ্ঠানটা একটু বোরিং লেগেছে। হয়তো এ প্রজন্মের মানুষ হওয়ায় আমার অত ভালো লাগেনি। কিন্তু আমার বাসার মুরব্বিরা হা করে অনুষ্ঠানটা দেখছিল। আরো একটি জিনিস আমার বেশ ভালো লেগেছে, সেটা না বললে অন্যায় হয়ে যাবে। খবর পড়ার সময় নিউজ প্রেজেন্টারদের বেশি বেশি মাথা নাড়ানো। শুনলে হাস্যকর মনে হলেও তারা মাথা নাড়ানোটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তাছাড়া খবরগুলো দেখলে ভালো লাগে। এত বড় একটা দেশ অথচ কোনো সংঘাত নেই। রাজনৈতিক সহিংসতাও নেই। এটা অবশ্য আমাদের জন্য স্বস্তির ব্যাপার। পাশের দেশটা এত শান্তিপূর্ণ হলে নিজের দেশটাও ঐ আইডিয়া নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। বিকেলের দিকে একটা নিউজ হয় নাম সম্ভবত ‘কৃষি দিবানিশি’। কৃষি সম্পর্কিত নানা তথ্য এখানে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে সম্ভবত বাতাবি লেবুর ফলন খুব বেশি হয়। এই নিউজটা অনেকদিন দেখেছি। মাঝে মাঝে দেখি বিটিভিতে মঞ্চ নাটকও দেখায়। অভিনয় যাই হোক মঞ্চ নাটকগুলো উপভোগ্য। এ দেশের চ্যানেলগুলো বিটিভি থেকে কিছু আইডিয়া নিতে পারে। ‘সুখী পরিবার’ নামের একটা অনুষ্ঠান চলতে দেখলাম। এ অনুষ্ঠান দেখে আমার মাসি হেসে উঠলেন। কারণটা এখানে নেই বললাম। রাতের বেলায় কোনো একদিন টকশো দেখলাম। সারাজীবন টকশোতে দেখলাম দুই পক্ষ থাকে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিপক্ষে বলে কিন্তু এখানে দেখলাম দু পক্ষই একই সুরে কথা বলে। আসলে হিংসা ভেদাভেদ এসব ভুলে তারা একই সুরে কথা বলে। এটা আমাদের এমনকি সবার জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

শুক্রবারে বিকালের দিকে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি দেওয়া হয়। ঠাম্মা জানালেন একসময় নাকি এ সিনেমা দেখার জন্য সবাই একত্রিত হতো। আমি বেশ মনোযোগ দিয়ে সিনেমা দেখতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরই বিজ্ঞাপন শুরু হয়। বেশ কিছুক্ষণ যাবত বিজ্ঞাপন চলল। হয়তো সিনেমা দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে ওঠার কারণে একটু বড় ব্রেকের জন্য বিজ্ঞাপন অনেক্ষণ যাবত দিয়ে থাকে। আইডিয়াটা ভালো লাগল। মনোমুগ্ধকর সিনেমা শেষ করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। দারুণ একটি চ্যানেল আমাদের দেশে চালু হলো। এটি আরো কয়েক যুগ আগে চালু হলে ভালো হতো। এখন পর্যন্ত যতবার বিটিভি দেখলাম একটুর জন্যও খারাপ লাগেনি। কোনো অনুষ্ঠান মানহীন মনে হয়নি। আমার একটু ভয় লাগছে কবে আবার আমাদের চ্যানেল দেখা বাদ দিয়ে এ দেশের মানুষ বিটিভি দেখা শুরু করে। তবে সেদিন সম্ভবত খুব বেশি দূরে নেই, যেদিন এ দেশের ঘরে ঘরে বিটিভি চলবে।  g