নারীর নিরাপত্তা ও শান্তি সূচকে পিছাইয়া দেশ

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৯, ২১:১৮

বলা হইয়া থাকে, একটা সমাজ কতটা সভ্য, উন্নত তাহা বোঝা যায় সেই সমাজে নারীর অবস্থান দেখিয়া। নারীর অবস্থান বলিতে এইক্ষেত্রে তাহার নিরাপত্তা, স্বাধীনতা— এককথায় তাহার জীবনমানকে বোঝায়। সেই হিসাবে, সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুসারে আমাদের সমাজ যে পিছনে পড়িয়া আছে তাহাই পরিলক্ষিত হয়। গবেষণাটি যৌথভাবে করিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি এবং নরওয়ের দ্য পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো। এই বিষয়ে সম্প্রতি তাহারা ’নারী, শান্তি, নিরাপত্তা সূচক ২০১৯-২০: নারীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ, ন্যায্যতা ও নিরাপত্তার মাধ্যমে টেকসই শান্তি অনুসরণ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে। ১৬৭টি দেশ লইয়া তৈরি এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২। দেখা যায়, বাংলাদেশ কেবল আফ্রিকার দেশগুলির চাইতে ভালো অবস্থানে রহিয়াছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে পিছাইয়া আছে বাংলাদেশ। তালিকায় নেপালের অবস্থান সার্কভুক্ত দেশগুলির মধ্যে সব চাইতে উপরে—৮৪তম; ইহার পরে আছে শ্রীলঙ্কা ১০৭তম, মালদ্বীপ ১১১তম, ভুটান ১১৮তম, ভারত ১৩৩তম; পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের নিচে—১৬৪তম। বাংলাদেশের এই পিছাইয়া থাকা দুঃখজনক। দীর্ঘদিন যাবত্ আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, সংসদের স্পিকার নারী হওয়া সত্ত্বেও এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এত খারাপ কেন তাহা সরকারের পাশাপাশি বিজ্ঞমহলকে ভাবিয়া দেখিতে হইবে। নারীকে পিছাইয়া রাখিয়া সত্যিকারের উন্নয়ন সম্ভব নহে।

প্রতিবেদনে নারীর ভালো থাকার তিনটি মৌলিক বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে, এইগুলি হইল : অন্তর্ভুক্তি, ন্যায্যতা ও নিরাপত্তা। এইক্ষেত্রে মোট ১১টি সূচক ব্যবহার করা হইয়াছে। অন্তর্ভুক্তি পরিমাপের সূচক হিসাবে শিক্ষা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিয়োগ, মোবাইল ব্যবহার ও সংসদে প্রতিনিধিত্বকে ধরা হইয়াছে। ন্যায্যতার সূচক হিসাবে দেখা হইয়াছে আইনগত বৈষম্য, পুত্রসন্তানের প্রতি পক্ষপাত ও বৈষম্যমূলক রীতিনীতিকে। নিরাপত্তার সূচক ছিল তিনটি :স্বামীর নির্যাতন, সামাজিক নিরাপত্তা ও কাঠামোগত সহিংসতা। প্রতিটি সূচকের জন্য নির্ধারিত নম্বর আছে। ১১ সূচকে বাংলাদেশের মোট নম্বর দশমিক ৬১২। কাজের সুযোগ, আইনগত বৈষম্য ও নারীর নির্যাতন—এই তিনটি সূচকে বাংলাদেশ কম নম্বর পাইয়াছে। বেশি নম্বর পাইয়াছে পুত্র সন্তানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব, সামাজিক নিরাপত্তা ও সংঘবদ্ধ সহিংসতা—এই তিনটি সূচকে। এইক্ষেত্রে প্রথম অবস্থানে থাকা নরওয়ের নম্বর দশমিক ৯০৪ এবং সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা ইয়েমেনের নম্বর দশমিক ৩৫১। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ পুরুষ নারীদের বাইরে কাজ করা সমর্থন করে না।

জনসংখ্যার অর্ধেক অংশ যে নারী তাহাদের যে কোনো মূল্যে নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করিতে হইবে। বাংলাদেশের সংবিধানেও নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হইয়াছে; কিন্তু আমাদের সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতার হার অনেক বেশি। দৈনিক পত্রিকায় প্রতিদিনই নারী হত্যা, ধর্ষণ, অত্যাচারের খবর প্রকাশিত হইতে দেখা যায়। ইহা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক। নারীর প্রতি সহিংসতা কমাইয়া আনিতে সমাজের সকলপক্ষকে ঐকান্তিক  প্রচেষ্টা করিতে হইবে।