একজন আশিক আহমেদ ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৯, ২১:১৮

পৃথিবীতে আমেরিকাকে বলা হয় অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য। ১৬০০ শতাব্দী হইতে এখানে ব্রিটিশ ও অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশের নাগরিকরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে দলে দলে আসিতে থাকেন। প্রথম অভিবাসীদের ৯০ শতাংশ ছিল কৃষক। পরে তাহারা নিজেরাই বিভিন্ন খামার গড়িয়া তোলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন যতই অভিবাসীদের নিয়া বিরূপ মন্তব্য করুন না কেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হইতে শুরু করিয়া অনেকেরই পূর্ব-পুরুষ ছিলেন অভিবাসী। আমেরিকাকে বলা হয় গোল্ডেন ল্যান্ড, ল্যান্ড অব দ্য ফ্রি, ল্যান্ড অব ফ্রিডম ইত্যাদি। যেইসব অভিবাসী ইহার সদ্ব্যবহার করিতে পারেন, তাহারাই সফল হন। অনুরূপভাবে অস্ট্রেলিয়াও আজকাল অভিবাসীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ১৯৪৫ সাল হইতে অস্ট্রেলিয়ায় আসা অভিবাসীর সংখ্যা ৭ মিলিয়নেরও বেশি। ১৯৭০ সালের পর হইতে এই দেশে এশিয়া ও অন্যান্য অইউরোপীয়দের অভিবাসন বৃদ্ধি পাইয়াছে। তাহাদেরই একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সফল অভিবাসী নাগরিক আশিক আহমেদ (৩৮)।

আশিক আহমেদকে লইয়া আমাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করিবার ও গর্বিত হইবার যুক্তিসংগত কারণ রহিয়াছে। কেননা আশিক আহমেদ এখন অস্ট্রেলিয়ার তরুণ শীর্ষ ধনীদের অন্যতম। অস্ট্রেলিয়ার ফিন্যান্সিয়াল রিভিউয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশটির ১০৩ তরুণ শীর্ষ ধনীর মধ্যে তাহার অবস্থান ২৫তম। তিনি বর্তমানে ‘ডেপুটি’ নামের হিসাবরক্ষণবিষয়ক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও)। তাহার সম্পদের পরিমাণ ১৪ কোটি ৮০ লক্ষ ডলার যাহা বাংলাদেশি মুদ্রায় এক হাজার ২৫০ কোটি টাকার বেশি। তাহার জীবন সংগ্রাম ও উত্থানের কাহিনি বিস্ময়কর। মাত্র ১৭ বত্সর বয়সে তিনি বাংলাদেশ হইতে অস্ট্রেলিয়ায় যান। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের একটি ফাস্টফুড চেইনে কাজ শুরু করেন। শুরুতে ঘণ্টাভিত্তিক বেতনে কাজ করিতেন তিনি। এই ধরনের কাজে কাজের সূচির (রোস্টার) হিসাব রাখা বেশ ঝামেলাপূর্ণ। মালিক ও কর্মী দুই পক্ষের জন্যই অসুবিধা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সহজ উপায় খুঁজিতে গিয়াই গণিত ও বিজ্ঞানে আগ্রহ ও কর্মক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি এই সফটওয়্যারটি তৈরি করেন ২০০৮ সালে। ইহাই তাহার ভাগ্যের চাকা ঘুরাইয়া দেয়। এই সফটওয়্যারটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের রোস্টার তৈরি ও বেতনের হিসাবরক্ষণের কাজটি অত্যন্ত সহজ করিয়া দেয়। বর্তমানে ইহার গ্রাহক সংখ্যা ১ লক্ষ ৮৪ হাজার। ইহার মধ্যে রহিয়াছে নাসা, আমাজান, উবার, গুগল, ম্যাকডোনাল্ডস, কম্পাস ও অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ এয়ারলাইন্স ক্যান্টাসও।

আশিক আহমেদের মতে, ‘জীবনের বৈধতা অন্য মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে আসে।’ তিনি অভিবাসী উদ্যোক্তাদের যে পরামর্শ দিয়াছেন তাহাও এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন, ‘অস্ট্রেলিয়া একটি দুর্দান্ত জায়গা এবং সব সময় সুযোগ সন্ধান করুন এবং তাহা হইতে সর্বোচ্চটা পাইতে চেষ্টা করুন; অন্য ব্যক্তির জীবনকে সমৃদ্ধ করিবার জন্য আপনার লক্ষ্যকে অনুসরণ করুন।’ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের যেই গুণটি সবচাইতে লক্ষণীয় তাহা হইল—সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ প্রদান, আইনের শাসন, উদ্ভাবনা ও সৃজনশীলতার প্রতি গুরুত্বারোপ প্রভৃতি। এইসব গুণাবলি আমরা অর্জন করিতে পারিলে কোনো আশিক আহমেদকে আর অস্ট্রেলিয়ায় যাইতে হইবে না। এই দেশে থাকিয়াই তাহারা তাহাদের মেধা, মনন, সৃজনশীলতা ও পরিশ্রমের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করিতে পারিবেন।