ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। বিশ্বের মধ্যে গর্ব করার মতো বাংলাদেশের যে কয়েকটি উপাদান রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো ইলিশ। অত্যন্ত সুস্বাদু শ্রেণির মাছ হওয়ায় বিশ্বব্যাপী ইলিশের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। বিশ্বের মোট ১১টি দেশে ইলিশ পাওয়া গেলেও মোট ইলিশের প্রায় ৭০-৭৫ ভাগই আহরিত হয় বাংলাদেশ থেকে। যার কারণে ইলিশ এখন বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত।
অন্যান্য দেশে ইলিশ উত্পাদন হ্রাস পেলেও ভৌগোলিক উত্কর্ষতা এবং ইলিশ রক্ষায় সরকার গৃহীত নানামুখী পদক্ষেপের কারণে প্রতিবছরই ইলিশ উত্পাদনে বাংলাদেশ গড়ছে নতুন নতুন রেকর্ড। ফলশ্রুতিতে গত দশ বছরে দেশে ইলিশের উত্পাদন বেড়েছে প্রায় ৭৮ ভাগ।
ইলিশ রক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে বর্তমানে ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। প্রজনন মৌসুম হওয়াতে গত ৯ অক্টোবর থেকে আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন সরকার ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। এই সময়টাতে প্রায় ৮০ ভাগ মা ইলিশ নদীতে এসে ডিম ছাড়ে। প্রতিটা ইলিশের ডিমের পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ। এই ডিমের ১০ ভাগও যদি মাছ হয় তাহলে তার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৫০ হাজার। সুতরাং মা ইলিশ ধরার মাধ্যমে এই অনাগত বিপুল সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে ফেলাটা ইলিশের অস্তিত্বের জন্য যেমন হুমকিস্বরূপ, তেমনি আমাদের জেলেদের জন্যও আত্মঘাতীই বটে। অথচ বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিনিয়তই জেলেরা মা ইলিশ নিধনের মতো আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার সময়টাতে ইলিশ আহরণ, পরিবহন এবং বিপণন বন্ধ থাকার কথা থাকলেও অনেকেই তা মানছেন না। প্রতিনিয়তই প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে, আবার কোথাও কোথাও দিনেরবেলাতেও ইলিশের হাট বসছে। অবৈধ এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার কথাও শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। তাই জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষার্থে সর্বপ্রথম যেটি প্রয়োজন তা হলো জনসচেতনতা তৈরি করা। জেলে এবং সাধারণ জনগণ সবাইকেই এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। নিষেধাজ্ঞার এই সময়টুকুতে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখলে ভবিষ্যতে ইলিশের উত্পাদন কতটা বৃদ্ধি পাবে এবং তাতে জেলেরা কতটা লাভবান হবে সে বিষয়ে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।
প্রয়োজনে জেলে পল্লিগুলোতে গিয়ে উঠান বৈঠক করে তাদের বুঝানো যেতে পারে। তবে এর পাশাপাশি সরকারকে ভুক্তভোগী জেলেদের জীবিকা নির্বাহের বিকল্প ব্যবস্থাও করে দিতে হবে। প্রচলিত বিচ্ছিন্নভাবে সাহায্য প্রদানের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ভুক্তভোগী সকল জেলেকে সাহায্যের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা আনয়ন কখনোই সম্ভব হবে না। এছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি আরো বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে আলাদা ফোর্স গঠন করা যেতে পারে। সাধারণ জনগণেরও উচিত নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ খাওয়া থেকে বিরত থাকা। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে জাতীয় সম্পদ ইলিশকে বিপন্ন হওয়া থেকে রক্ষা করে দেশের গৌরব অক্ষুণ্ন রাখতে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
