ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস। ৪৭ বছর পূর্বে ১৯৭১ সালে এ মাসে বাঙালির জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়। ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের মহান বিজয় দিবস। বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠালাভ করে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।
ডিসেম্বর শুধু বিজয়ের নয়, বেদনারও মাস। এ বিজয়ের পেছনে রয়েছে এ দেশের সেরা বুদ্ধিজীবীসহ ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, কয়েক লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানো, অগ্নিসংযোগে লাখ-লাখ বাড়িঘর ভষ্মীভূত হওয়া ও এক কোটি জীবন বিপন্ন মানুষের ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণের মতো নজিরবিহীন বিয়োগান্তক ঘটনা। পাকিস্তানি হানাদাররাই শুধু এ অপরাধ সংঘটিত করেনি, পাকিস্তানপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী ও পিডিপি’র নেতা-কর্মীরা তাদের দোসর হিসেবে মানুষ হত্যাসহ এসব জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশ নেয়। এদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্র শিবির)-এর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক। গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের পাশাপাশি তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মিলে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ঠাণ্ডা মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তালিকা ধরে হত্যা করে। এ জন্য জামায়াত ও ইসলামী ছাত্র সংঘের উদ্যোগে সৃষ্টি হয় আলবদর, আলশামস নামে বিশেষ ঘাতক বাহিনী। এ কুখ্যাত বাহিনী এসব বুদ্ধিজীবীদেরকে নিজ বাসা থেকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে চোখ বেধে অনেককে প্রথমে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (বর্তমান মোহাম্মদপুর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ)-এর টর্চার কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁদের ওপর নির্যাতন শেষে ১৪ই ডিসেম্বর মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হাত ও চোখ বাধাঁ অবস্থায় এক এক করে প্রথমে গুলি ও এরপর বেয়নেট চার্জ করে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের পাশাপাশি এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা খুবই সক্রিয় ও মূল্যবান অবদান রাখেন। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসর জামায়াত-আলবদর-আলশামস-ইসলামী ছাত্রসংঘ নিজেদের পরাজয়ের প্রতিশোধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে বুদ্ধিবৃত্তিক নের্তৃত্বশূন্য করার হীন লক্ষ্যে বেছে-বেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রের এ দেশের সেরা মেধাবী সন্তানদের নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। এতো কিছুর পরও ’৭১-এর ঘাতক-খুনি চক্র বাংলাদেশের অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দিতে পারেনি।
লেখক: উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
