শুক্রবার, দুপুর শুরু হওয়ার ঠিক আগের সময়টায় কুর্দিশ সালাহাদীন সেন্টারের (কুর্দিদের ভালোমন্দ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান) অভ্যর্থনা কক্ষ জুড়ে আজান প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো। স্যুট পরা দুটি ছোট্ট ছেলে মহিলাদের নামাজ কক্ষের দিয়ে ভোদৌড় শেষ করে হাসছিলো মুখচাপা দেয়া হাসি। কয়েকজন পথচারি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে কোনোমতে জুতা খুলে মেঝেতে যখন বসার ঠাঁই পেয়ে যান, তখন মুচকি হাসি হাসলেও মনে হচ্ছিল যেন সেটা বিজয়ের হাসি। মহিলাদের নামাজঘরে কয়েকজন কথা বলছিলেন ফিসফিস করে। কিন্তু ইমাম সাহেব বলা শুরু করার পর দুটি কক্ষের প্রাপ্তবয়স্করাই সম্পূর্ণ নীরব হয়ে যান। শিশুদের নিচু স্বরের কথাবার্তা এর পরেও যদিও শোনা যাচ্ছিল, তাতে কেউ নিষেধ না করে সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল ইমাম সাহেবের বয়ানের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য টেনেসের নাশভিলে অবস্থিত সালাহাদিন সেন্টারের প্রত্যেক জুম্মার নামাজের আগে এ দৃশ্যগুলো অতি সাধারণ।
জুম্মার নামোজের পর নামাজিরা সালাহাদিন সেন্টারের অভ্যর্থনাকক্ষে ফের সমবেত হয়ে একে অপরকে পেস্ট্রি পেতে সহায়তা করছিলেন; সঙ্গে চলছিল খোশগল্প। বাকিরা কিছুদূর হেঁটে গাড়ির কাছে গিয়ে সেটিকে একটি অঙ্কিত দেওয়ালের সামনে পার্ক করে বাজারে সেরে নিচ্ছিলেন কেনাকাটার কাজ। পেস্ট্রির পর্ব শেষ হলে পুরো অভ্যর্থনা কক্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রিলড মাংস ও সদ্য সেঁকা রুটির সুগন্ধ।
সালাহাদিন সেন্টারে কয়েক ঘণ্টা কাটালে আপনি হয়তো ভুলেই যাবেন যে, আপনি যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আদলে গড়ে ওঠা সালাহাদিন সেন্টারটি নাশভিলের ভেতরে পরিচিতি পাওয়া ছোট্ট কুর্দিস্তানের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সবচেয়ে বেশি কুর্দির বসবাস এখানেই। সংখ্যায় তারা প্রায় ১৫ হাজার, যা কিনা ওই দেশে বসবাসরত কুর্দিদের মোট সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। অবশ্য নাশভিলের বিশেষ পরিচিতি দেশজ সংগীতের রাজধানী হিসেবে। এখানে বসবাসরত কুর্দিদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, যারা বসবাস করছেন কয়েক দশক ধরে।
নাশভিলে বসবাসরত কুর্দি ভোটাররা এতদিন মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুগত থাকলেও ইদানীং তার ওপর থেকে তাদের মন উঠে গেছে। তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, সামনের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প আর তাদের সমর্থন পাবেন না। তিনি অতি সম্প্রতি সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে মার্কিন সেনাদল প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়াতেই বেজায় চটেছে মার্কিন মুলুকে বসবাসরত সব কুর্দি। তাদের ধারণা, প্রেসিডেন্ট তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আর সে সুযোগে তুর্কি বাহিনী কুর্দি ওয়াইপিজি মিলিশিয়াদের ওপর সামরিক হামলা চালিয়ে তাদেরকে ছাতু বানিয়ে ফেলছে। এই ওয়াইপিজি মিলিশিয়া আইএস গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিল। তুর্কি সরকার এই ওয়াইপিজিকে কিছুদিন আগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ঘোষণা করে।
ক্ষুদ্র কুর্দিস্তানের কুর্দিরা আতঙ্কিত ও হতাশ। সালাহাদিন সেন্টারে বিকালের নামাজ আদায় করা এক মহিলা তো সরাসরিই বলে দেন, আমার ধারণা আগামী নির্বাচনে কোনো কুর্দিই আর ট্রাম্পকে ভোট দেবে না। তাহলে কার উচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া, এই প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি এভাবে—যে কেউ, কিন্তু তিনি ছাড়া। তার বক্তব্য অনুসারে, ট্রাম্পের উচিত ছিল কুর্দিদের পক্ষ হয়ে কাজ করা। ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়ার বিপক্ষে যেভাবে আমেরিকার স্বার্থে কাজ করেছিল কুর্দিরা।
ইরাকের সহিংসতা এড়াতে নাশভিলে শরণার্থী হিসেবে কুর্দিদের আসা শুরু হয় ১৯৭০’র দশকে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার টিনেসেতে যথেচ্ছভাবে কুর্দিদের ঠাঁই দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও কুর্দি অভিবাসীরা চূড়ান্ত ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিল নাশভিলে বসবাসের। তাদের কুর্দিস্তানের সঙ্গে এখানকার জলবায়ু ও গাছপালার যথেষ্ট মিল রয়েছে। নাওজাদ হাওরামি বসবানের জন্য নাশভিলকে বেছে নেওয়ার কারণ ছিল স্থানীয়দের আতিথেয়তা, উন্মুক্ততা ও আন্তরিকতা। সালাহাদিন সেন্টারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও অফিস ব্যবস্থাপক নাওজাদ হাওরামি ১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে আসার কিছুদিন পরই নাশভিলে থিতু হয়েছিলেন। নাশভিল অভিমুখে কুর্দি অভিবাসীদের দ্বিতীয় সে াত বয়েছিল ১৯৯০’র দশকে, সাদ্দাম হুসেন রাসায়নিক অস্ত্র দিয়ে কুর্দিদের গ্রাম ও শহর জ্বালিয়ে দেওয়ার পর।
নাশভিল শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে গড়ে উঠেছে মিনি কুর্দিস্তান। সালাহাদিন সেন্টার ছাড়াও এখানে রয়েছে একটি তুর্কি-কুর্দি রেস্টুরেন্ট ও কয়েকটি কুর্দি সুপারমার্কেট। সেখানকার নিউরোজ মার্কেটে নানারকম রুটি সেঁকা হয় ঐতিহ্যবাহী পাথরের ওভেনে। কোল্ড স্টোরেজে ঝুলানো থাকে একেবারে টাটকা ও বিশাল আকারের সব মাংসের টুকরো। দোকানের সামনে শোভা পায় শরমা ও বাকলাভা। সালাহাদিন সেন্টার থেকে গাড়ি ড্রাইভ শুরু করলে কয়েক মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় কুর্দিশ কিন্ডারগার্টেনে। কুর্দিদের জন্য আলাদা কবরস্থান ও ফুটবল মাঠও রয়েছে। তারা ফুটবল খেলাটাকে একটু বেশিই ভালোবাসে। হাওরামি যুক্তরাষ্ট্রকে মনে করেন স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের দেশ। এখানকার নাগরিক হতে পেরে তিনি গর্বিতও। কিন্তু ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে তিনি বিস্মিত। তার দৃঢ় বিশ্বাস যে, সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলকে কুর্দিদের জন্যে ছেড়ে দেওয়াটা মোটেই ঠিক হয়নি। এর জন্য ভবিষ্যতে পস্তাতে হবে আমেরিকাকে।
