চট্টগ্রাম বন্দরের ৫০ কোটি টাকায় কেনা জাহাজ ছয় বছরে স্ক্র্যাপ হচ্ছে!

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৩৪

চট্টগ্রাম বন্দরের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনটি জাহাজ। গত প্রায় দুই বছর যাবত্ জাহাজ তিনটি অলস বসে আছে। চবক সন্তোষজনক ভাড়া না পাওয়ায় জাহাজগুলো ভাড়াও দিতে পারছে না। পূর্বের অভিজ্ঞতা ভালো না হওয়ায় নিজেরা পরিচালনার দায়িত্বও নিচ্ছে না। ফলে শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে ভাড়ার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সন্তোষজনক ভাড়া পাওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানা যায়। এরপরও আশানুরূপ ভাড়া কিংবা সাড়া পাওয়া না গেলে স্ক্র্যাপ জাহাজ হিসেবে বিক্রি ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যত দ্রুত সম্ভব জাহাজ তিনটির ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারলে বন্দর আরো লোকসান থেকে রক্ষা পাবে। চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে কনটেইনার পরিবহনের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১০ সালে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের পানগাঁও এলাকায় একটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করে। চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের জট কমানোর জন্য ঢাকা অভিমুখী কনটেইনার নৌপথে পরিবহনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল নির্মিত হলেও চট্টগ্রাম-পানগাঁও রুটে কনটেইনারবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো জাহাজ কোম্পানির আগ্রহ দেখা যায়নি। তাছাড়া, চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনার পৌঁছার পর আবার অন্য একটি জাহাজে তুলে পানগাঁওয়ে নিয়ে যাওয়া, পানগাঁও থেকে ট্রাক বা লরিযোগে নিজ গন্তব্যে পৌঁছানো ছিল জটিল বিষয়। তাছাড়া ট্যারিফসহ যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে কতটুকু নিরাপদ হবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছিল বিভ্রান্তি। অন্যদিকে প্রশাসনিক জটিলতাও ছিল। এতে করে দেখা যায়, পানগাঁও টার্মিনাল নির্মাণের পরও অনেক দিন এটি একপ্রকার অলস পড়ে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যপরিধি ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও ২০১৩ সালে চবক বিদেশ থেকে তিনটি কনটেইনারবাহী জাহাজ ক্রয় করে। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এমভি পানগাঁও এক্সপ্রেস, পানগাঁও ভিশন ও পানগাঁও সাকসেস নামক তিনটি পুরোনো জাহাজের প্রতিটি ১২০ থেকে ১৪০টি কনটেইনার পরিবহনের ক্ষমতাসম্পন্ন। জাহাজগুলো কেনার ব্যাপারে সে সময় পত্রপত্রিকায় ব্যাপক নেতিবাচক সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল। এরপরও চবক তিনটি জাহাজ চট্টগ্রাম-পানগাঁও রুটে চালু করে। বন্দর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জাহাজগুলো পরিচালনা করে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পরবর্তী পর্যায়ে জাহাজ তিনটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেয়। একটি বেসরকারি গ্রুপের কাছে প্রতিটি জাহাজ মাসিক ১৪ লাখ টাকা ভাড়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

প্রায় দুই বছর আট মাস জাহাজ তিনটি পরিচালনার পর বিপুল পরিমাণ লোকসানের কারণে ঐ শিল্প গ্রুপ ২০১৭ সালের শেষ দিকে চবকের কাছে ফেরত দেয়। চবক জাহাজ ভাড়ার বকেয়া টাকা এবং জাহাজের কন্ডিশন পূর্বাবস্থায় করে দেওয়ার জন্য প্রায় ছয় মাস গ্রহণ করেনি। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে শিল্প গ্রুপটি বন্দরকে ১ কোটি ২ লাখ টাকা প্রদান করে। জানা যায়, ২০১৭ সালের শেষ দিকে জাহাজ তিনটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকে এ পর্যন্ত অলস পড়ে আছে। ইতিমধ্যে চবকের পক্ষ থেকে জাহাজ তিনটি পুনরায় ভাড়ায় দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু প্রতিটি জাহাজ পূর্বের মাসিক ১৪ লাখ টাকার স্থলে মাত্র ৩ লাখ টাকা করে প্রদানের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়।

চবকের পক্ষ থেকে জাহাজ তিনটির ক্ষেত্রে বন্দরের বিনিয়োগসহ সার্বিক খরচ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিটি জাহাজের মাসিক ভাড়া ৬ লক্ষাধিক না হলে বন্দরকে লোকসান গুনতে হবে। তাছাড়া চবক জাহাজ তিনটির ব্যাপারে একটি উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানের মতামত গ্রহণ এবং পরবর্তীতে আইন কর্মকর্তার মতামত গ্রহণ করে। তাদের মতে, জাহাজ তিনটি বিক্রি করার পক্ষে মতামত দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রে জানা যায়। চবক উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাহাজ তিনটির ব্যাপারে প্রথমে ভাড়া বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চবক প্রতিটি জাহাজের ভাড়া সন্তোষজনক তথা ৬ লাখের অধিক পেলে ভাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যথায় জাহাজ তিনটি বিক্রি করার বিকল্প সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে এগোবে বলে জানা যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের উপসংরক্ষক ক্যাপ্টেন মো. ফরিদুল আলম জানান, চবক কনটেইনারবাহী তিনটি জাহাজ ভাড়ায় দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রদানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।