রুশ প্রচেষ্টায় নির্ভার দামেস্ক

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ২১:২৬

ইসলামিক স্টেটের কথিত উত্থানের পশ্চিমা আশঙ্কা ভন্ডুল করে সাত বছরের গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত সিরীয় পরিস্থিতির আরো অগ্রগতি সাধিত হয়েছে গত সপ্তাহে। মূলত তুরস্ক কর্তৃক সিরিয়ায় সামরিক অভিযান-উত্তর প্রেক্ষাপট দামেস্কে স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এনে দিয়েছে। একই সঙ্গে গৃহযুদ্ধে হাতছাড়া ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বতীরের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে সিরিয়ান সেনাবাহিনী। উল্লেখ্য, এ মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রতিবেশী তুরস্ক কুর্দি দমনের অজুহাতে সিরিয়া সীমান্তের অভ্যন্তরে সেনা অভিযান শুরু করে। এই বিতর্কিত সামরিক তত্পরতায় ঝুঁকির মুখে পড়ে সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব। ফলে গত সাত বছরের মধ্যে আরেক দফা মারাত্মক সংকটে পড়ে দামেস্ক। বরাবরের মতো এই সংকট উত্তরণে দামেস্কের পাশে দাঁড়ায় রাশিয়া। অন্যদিকে তুরস্ককে সেনা অভিযানের সুযোগ করে দিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের চাপের মুখে পড়ে আমেরিকা। বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধ-উত্তর যুগে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অত্যন্ত আস্থাভাজন স্বাধীনতাকামী কুর্দিরাও আমেরিকার আচরণে রুষ্ট হন। এই প্রেক্ষিতে সিরিয়া সংকটের গুরুত্বপূর্ণ সশস্ত্র পক্ষ কুর্দিরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। তাই টার্কি সেনা আক্রোশ থেকে পরিত্রাণ পেতে শেষ পর্যন্ত কুর্দিরা সিরিয়ার শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে এই আলোচনা ফলপ্রসূ হয়। এ পর্যায়ে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় সরকারি বাহিনীর অনুকূলে শান্তিপূর্ণ নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় চলে আসে সব কুর্দি। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় মূলত রাশিয়ার পর্যটন শহর সোচিতে রাশিয়া ও তুরস্কের প্রেসিডেন্টের মধ্যকার আলোচনার ভিত্তিতে। ঐ সিদ্ধান্তের আলোকেই ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বতীরের তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় শুরু হয় রুশ-সিরিয়া যৌথ সামরিক টহল। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকা থেকে কুর্দিদের ৩০ কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও পান রাশিয়ান মিলিটারি পুলিশ ও সিরিয়ান বর্ডার গার্ড। এই বাস্তবতা সিরিয়ায় তুরস্কের সেনা অভিযানের যুক্তিকতা কমিয়ে আনে। পাশাপাশি সামরিক ও কূটনৈতিক সমীকরণেও যোগ হয় ভিন্ন মাত্রা। বলা চলে তুরস্কের অসমাপ্ত অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বতীরের বিস্তীর্ণ এলাকায় সিরিয়ান সেনাদের প্রবেশ সহজ করে দেয়। এক্ষেত্রে সবকিছুই দ্রুত ওলটপালট করে দেয় কুর্দিদের ব্যাপারে ওয়াশিংটন ও দামেস্কের হঠাত্ নীতি পরিবর্তন। যদিও রুশ-টার্কি শীর্ষ আলোচনার মতোই এরদোয়ান-পেন্স, পম্পেও আংকারা বৈঠক সর্বশেষ প্রেক্ষাপট দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই তুরস্কের সিরিয়া অভিযান আপাতত সমাপ্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাচ্ছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে নানা অস্থিরতা এবং সিরিয়া সংকটের নানা জটিলতায় এই স্থিতাবস্থা কতদিন বহাল থাকে সেটি দেখার বিষয়। কেননা সিরিয়া সংকট ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য সক্রিয় পক্ষগুলো একটি বৃহত্ যুদ্ধের প্রতি লক্ষ্য রেখেই এই অঞ্চলে ক্রমাগত শক্তি সমাবেশ করে যাচ্ছেন। এই সূত্র ধরেই ক্রমাগত পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি। মূলত ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীর বা লেভান্ট অঞ্চলের দেশগুলোর ভূখণ্ডগত আকার-আকৃতির পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্ট্রি করাই পশ্চিমাদের প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে ক্রিয়াশীল পক্ষগুলোর সিরীয় ভূখণ্ডের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি সর্বজন বিদিত। অন্যদিকে রাশিয়া ও ইরানের লক্ষ্য হচ্ছে এই প্রক্রিয়া নস্যাত্ করা; কিন্তু তুরস্ক কর্তৃক হঠাত্ সিরিয়ান সীমানা অতিক্রম করে সামরিক অভিযান আপাতদৃষ্টিতে সবকিছুই স্থবির করে দেয়। যদিও শেষ পর্যন্ত এই অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় সিরিয়া কিংবা তার মিত্রদের জন্য বাড়তি কোনো উদ্বেক কিংবা উত্কণ্ঠার কারণ হয়ে উঠেনি। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে তুরস্কের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। কেননা সিরিয়ান সেনারা ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বতীরে ঢুকে পড়ায় দামেস্ক ও আংকারার মধ্যে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে। অবশ্য এ ধরনের সংঘাত বন্ধে রুশ সেনারা উপযুক্ত ভূমিকা রাখবে বলে ঘোষণা দিয়েছে ক্রেমলিন। এতদসত্ত্বেও মাত্র দুই দিন আগে সিরিয়ার সীমান্ত শহর রাস আল আইনে সিরীয়-তুর্কি সেনাদের মধ্যে ছোটো আকারের সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। সংগত কারণেই এই অঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ঝুঁকি বিদ্যমান থাকছেই। তাই এখন সবারই নজর থাকবে পুতিন এরদোয়ান আলোচনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার দিকে। পাশাপাশি আমেরিকা ও তার মিত্ররা কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে আপাতদৃষ্টিতে সিরিয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি দামেস্কের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়। আর এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মস্কো। আমরা জানি প্রথম থেকেই রাশিয়া সিরীয়সংকটে সরাসরি জড়িত। এবার দেশটি সামরিক সমর্থনের পাশাপাশি দামেস্কের অনুকূলে একটি বড়ো ধরনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। যা মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রুশ নীতিকে আরো গতিশীল করবে নিঃসন্দেহে। এ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—কুর্দিদের ভবিষ্যত্, দামেস্ক-আংকারা সম্পর্ক ও সিরিয়ান সার্বভৌমত্ব নস্যাত্ করা সংক্রান্ত অন্যান্য তত্পরতা।

আমরা জানি, ২০১১ সালে হঠাত্ আরব বসন্তের দাবানলে জ্বলে উঠে মুসলিম অধ্যুষিত উত্তর আফ্রিকাসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য। ঐ বছরেই এই বসন্তের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে সিরিয়ায়। এরপর ধারাবাহিকভাবে দেশটির সামগ্রিক পরিস্থিতি চরম অবনতি হতে থাকেন। সর্বশেষ ২০১৫ সালে দেশটির বেশির ভাগ এলাকা সরকারবিরোধী বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এ পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সিরিয়া নিজের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র রাশিয়ার সাহায্য কামনা করে। দামেস্কের ডাকে সারা দিয়ে মস্কো দ্রুত সেখানে সৈন্য পাঠালে রুশ সহায়তায় ধীরে ধীরে দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় পুনঃনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় সিরীয় সরকার। সর্বশেষ গত বছর থেকেই সমগ্র সিরিয়া সরকারের সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণে চলে আসে; কিন্তু ব্যতিক্রম থাকে ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বতীর। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় এই সব এলাকায় শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তুলে কুর্দিসহ অন্য বিদ্রোহীরা। যা তুরস্কের জন্য সত্যিকার অর্থেই ঝুঁকির অবতারণা কারে। এই ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণ পেতেই আংকারা পূর্বপরিকল্পিত অভিযানের সূত্রপাত ঘটায়। যা স্পষ্টত আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির লঙ্ঘন। প্রশ্ন হচ্ছে—অভিযান শেষে তুরস্ক কী পেল? সোচি আলোচনার ভিত্তিতে সিরিয়া কর্তৃক কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণ করা তুরস্কের জন্য অত্যন্ত বড়ো প্রাপ্তি। যদিও এসংক্রান্ত সিরিয়ার দায়িত্ব আদানা চুক্তির মাধ্যমেই নির্ধারিত ছিল। উল্লেখ্য, সিরিয়া-তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় আদানা চুক্তির আওতায় সিরীয় সীমান্তে কুর্দিদের তুরস্কবিরোধী তত্পরতা দমনে দামেস্ক প্রতিশ্রতিবদ্ধ। এখন রাশিয়ার মধ্যস্থতায় কুর্দিদের সিরীয় সীমান্তের ৩০ কিলোমিটার ভেতরে টেনে আনা সম্ভব হলে আপাতত সন্তুষ্ট থাকতে পারে তুরস্ক। অন্যদিকে এই সেনা অভিযান শেষে সিরিয়াকে ভেঙে আলাদা রাষ্ট্র তৈরির প্রচেষ্টাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ক্রিয়াশীল পক্ষগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক সংবাদ। এর ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে দীর্ঘ ষড়যন্ত্রমূলক প্রক্রিয়াগুলোও ক্রমশ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। অন্যদিকে স্বাধীন কুর্দিস্থান রাষ্ট্রের স্বপ্নও বিলীন হওয়ার পথে। তুরস্কে প্রায় নিষ্ক্রিয় পিকেকের পর সিরীয় কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণে রাখা অবশ্যই তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক ও ইরানের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক ব্যাপার। এর মধ্যদিয়ে ইরাক ও ইরানি কুর্দিদের সুপ্ত আশা-আকাঙ্ক্ষাও হোঁচট খাবে। অবশ্য ইরাকি কুর্দিরা ইতিমধ্যে ভিন্ন মাত্রার ক্ষমতা উপভোগ করছে। এ অবস্থায় কুর্দিদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দীর্ঘ স্বপ্ন কার্যত শেষ হয়েছে বলেই ধরে নেওয়া। যদিও অস্থির মধ্যপ্রাচ্য সমীকরণে বড়ো পরিবর্তন এলে আবার পরিবর্তন হতে পারে প্রেক্ষাপট।

সবমিলিয়ে এখন দেখার বিষয়—সোচি আলোচনার অবশিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন। কেননা শুধু কুর্দিদের সরিয়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কুর্দিদের নিরস্ত্র করা থেকে তাদের মূলধারায় জনজীবনে ফিরিয়ে এনে সশস্ত্র কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড়ো বাধা আসবে আমেরিকা থেকেই। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেশটি সিরিয়া থেকে সরে এলেও ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা অবশ্যই সক্রিয় থাকবে। ইতিমধ্যে দেশটি সিরিয়ার তৈলক্ষেত্র লক্ষ্য করে নতুন করে সেনা সমাবেশের হুমকি দিয়ে রেখেছে। এটি অত্যন্ত ভীতিকর একটি সংবাদ। একই সঙ্গে আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে, এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য। তাই সামগ্রিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এই মুহূর্তে সিরিয়া নির্ভার এটি বলাই চলে।

n লেখক : বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা