কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রাণিসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্যনিরাপত্তায় প্রাণিসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও গুণমান সম্পন্ন প্রাণিজাত খাদ্যের উত্পাদন আজ হুমকির সম্মুখীন। এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ উত্পাদনে ব্যবহূত উপকরণ ও উত্পাদিত দ্রব্যাদির মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদের উত্পাদনকে ত্বরান্বিত করা এবং সর্বোপরি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘প্রাণিসম্পদ উত্পাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার স্থাপন প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে সরকারের মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ১লা জুলাই শুরু হলেও এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ৩০ জুন এবং এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা। পরবর্তীকালে এই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে এবং প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ১০৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা করা হয়েছে।
সর্বাধুনিক এ গবেষণাগারের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাদ্য ও ফিড এডিটিভসের গুণমান নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া প্রাণিজাত খাদ্য তথা মাংস, ডিম ও দুধের নমুনায় ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ, হরমোন, স্টেরয়েড ইত্যাদির রেসিডিউ পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ থেকে উত্পাদিত পণ্য ও উপজাতের রুটিন এনালাইসিস পরিচালনা করবে। অন্যদিকে আধুনিক গবেষণাগারটি প্রাণিসম্পদের খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণ এবং প্রাণিজাত পণ্যের গুণমানের সনদ প্রদান করবে। তাছাড়া খাদ্য নিরাপত্তায় কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করবে।
সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের একটি টিম সরেজমিন ঘুরে জানতে পারে, প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে ছয়তলাবিশিষ্ট একটি মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব, চারতলাবিশিষ্ট একটি ডরমেটরি ভবন, ডিপটিউবওয়েল, গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য গ্যাসের সংরক্ষণাগার তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গবেষণাগারটিতে ক্রমান্বয়ে স্থাপিত হচ্ছে ২৩০টি সর্বাধুনিক মেশিন। ইতিমধ্যে গবেষণাগারে NIRS (Near infrared Reflectance Spectorscopy) মেশিন স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে পশুপাখির খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে তার মধ্যকার পুষ্টিমান সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব হবে। এছাড়া এতে রয়েছে HPLC (High-performance Liquid churomatorgraphy) মেশিন, যার মাধ্যমে অধিক মুনাফার আশায় খামারিরা পশুপাখির খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ প্রোমোটার ব্যবহার করলে খাদ্যের নমুনা এইচপিএলসি যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করে তা সনাক্ত করা যাবে এবং এই গবেষণাগারে থাকছে LCMS (liquid chromatography mass spectometry)। পশুপাখি থেকে উত্পাদিত দুধ, ডিম, মাংসে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ খুব অল্প পরিমাণ থাকলেও তা শনাক্ত করা যাবে এলসিএমএস যন্ত্রের মাধ্যমে। এছাড়া পশুপাখির খাদ্য ও পশুপাখি থেকে উত্পাদিত দুধ, ডিম ও মাংসে কোনো ক্ষতিকর ধাতব পদার্থ থাকলেও তা AAS (atomic absorption Spectrometry) যন্ত্রের মাধ্যমে জানা যাবে। অন্যদিকে কোনো ক্ষতিকর জীবাণু থাকলে তা মালডি-উফ যন্ত্রের মাধ্যমে এবং মিল্ক এনালাইজারের মাধ্যমে দুধের গুণাগুণ সনাক্ত করা সম্ভব হবে। জানা যায়, আগামী জানুয়ারি থেকে ল্যাবরেটরিতে কিছু কিছু পরীক্ষার কাজ শুরু হবে। তবে জুলাই ২০২০ থেকে পূর্ণাঙ্গ রূপে সব পরীক্ষার কাজ শুরু হবে। এই ল্যাবরেটরি থেকে নির্ধারিত ফির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে খামারিরা এসব পরীক্ষা করাতে পারবেন।
n লেখক :গণযোগাযোগ কর্মকর্তা, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালায়
