পরিণত রাষ্ট্রের উদাহরণ

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০১৯, ২১:২৭

মন্ত্রিপরিষদশাসিত সরকারব্যবস্থায় একজন রাষ্ট্রপতি থাকেন। কিন্তু তাহা অনেকটাই আনুষ্ঠানিক পদ, যাহাকে ইংরেজিতে বলা হয় সেরেমোনিয়াল পোস্ট। কিন্তু রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপতি থাকেন সর্বাধিক ক্ষমতার অধিকারী। তাহার মধ্যে আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সাংবিধানিকভাবে অসীম ক্ষমতা ভোগ করিয়া থাকেন। তিনি আইন প্রণয়নে বাধা প্রদান, স্থগিত ও ভেটো প্রদান করিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের সভা আহ্বান অথবা মুলতবি করিতে পারেন। পদাধিকারবলে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ ফেডারেল গভর্নমেন্টের সকল নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা তিনি রাখেন। নির্বাচিত হইয়াই তিনি ক্ষমতাগ্রহণের পূর্বেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি, কূটনীতিক, হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তাসহ ৬ হাজার ফেডারেল পদে নিজের ইচ্ছামাফিক স্বাধীনভাবে নিয়োগ দিয়া থাকেন। বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিশালী এই দেশের প্রেসিডেন্ট হামলা-হাঙ্গামা বিষয়ে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে যে কোনো আদেশ দিতে পারেন কাহারো অনুমোদন অথবা পরামর্শ ব্যতিরেকে। তথাপি তাহার উপর খড়্গহস্ত হইয়া থাকে যুক্তরাষ্ট্রের আইনের শাসন ও সিস্টেম। আতোয়া দ্য জুপেরির সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য লিটল প্রিন্স’-এ খুদে রাজকুমারের দেখা সেই একা পাথরের উপর বসিয়া থাকা রাজার মতো। রাজা রাজকুমারকে বলিলেন, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু আমার কথামতো চলে। আমি বলিলে সূর্য অস্ত যায়, চন্দ্র উদয় হয়। ক্ষুদ্র রাজকুমার বিনীত অনুরোধ জানাইল, রাজামশাই, বড়োই শখ সূর্যাস্ত দেখিবার। একটু আদেশ করুন অস্ত যাইতে। রাজা বলিলেন, আমি তো নিয়ম ভাঙিতে পারি না। যদি ভাঙি, তাহা হইলে উহারা আমার কথা শুনিবে না।

তাহাই আমরা ঘটিতে দেখিতেছি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষেত্রে। তিনি অসীম ক্ষমতাশালী হওয়া সত্ত্বেও আইনের ব্যত্যয় ঘটিলে কেবল বিরোধী দলই নহে, প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও বিগড়াইয়া যান। আমরা দেখিলাম, প্রথমে ২০১৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ লইয়া রবার্ট মুয়েলারের রিপোর্টে। রিপোর্টে মুয়েলার প্রেসিডেন্টকে কোনো ছাড় দেন নাই। যদিও তাহা হইতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উত্তরণ ঘটিয়াছে, কিন্তু নাস্তানাবুদ হইতে হইয়াছে যথেষ্ট। তখনই তাহাকে অভিশংসনের জন্য ডেমোক্র্যাটরা উদ্যোগ লইতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু ডেমোক্রেটিক দলের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাহাতে সায় দেন নাই। কিন্তু গত ২৫ জুলাই ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেইনের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনেস্কিকে ফোন করিয়া ২০২০ সালের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোসেফ বাইডেন এবং তাহার পুত্র হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্ত করিবার জন্য যে চাপ দিয়াছেন এবং তাহা  লইয়া বর্তমানে যে টানাপোড়েন চলিতেছে উহা সামলাইতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যথেষ্ট বেগ পাইতে হইতেছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব পাশ করা হইয়াছে। একাধিক হইসেলব্লোয়ার (তথ্য ফাঁসকারী) ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনিয়াছেন ট্রাম্পের কথোপকথন ‘লক ডাউন’ করিবার বিষয়ে। এইসব ঘটনাবলি হইতে আমরা একটি বিষয় লক্ষ করিয়া থাকি :যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অসীম ক্ষমতাশালী হইলেও দেশের প্রতিটি কর্মকর্তা নিজ নিজ দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করিতে পারেন। তাহা রবার্ট মুয়েলারই হউক আর ট্রাম্পের কথোপকথন শ্রবণকারী লে. কর্নেল আলেক্সান্ডার ভিন্ডম্যানই হউক। ঐ দেশে একের দায়িত্বে অন্যের হস্তক্ষেপের কোনো রেওয়াজ নাই, উপায়ও নাই। অর্পিত দায়িত্ব পালনের এই সংস্কৃতি একটি শিক্ষণীয় বিষয়ই বটে। এই সংস্কৃতি তৈরি না হইলে কোনো দেশকে দেশ বলা যায় কি না তাহা লইয়া আমাদের সন্দেহ আছে।