আলোকপাত

ই-বর্জ্য জলবায়ুর জন্য মারাত্মক হুমকি

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০১৯, ২১:২৮

ই-বর্জ্য হচ্ছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য। যেমন পরিত্যক্ত টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ক্যামেরা, এয়ারকন্ডিশনার, মাইক্রোওভেন, সিএফএল বাল্ব, ওয়াশিং মেশিন, মুঠোফোন, ডিভিডি প্লেয়ার, ইলেকট্রনিক খেলনাসামগ্রী ইত্যাদি। এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহারের পরে যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখনই এটি বর্জ্যে পরিণত হয়, যা আমাদের কাছে ই-বর্জ্য নামে পরিচিত। সাধারণ দৃষ্টিতে এগুলোকে চিরাচরিত বর্জ্য মনে হলেও আসলে কিন্তু তা নয়। ই-বর্জ্যের রয়েছে মারাত্মক রেডিয়েশন, যা বিভিন্নভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে আমাদের ব্যবহূত ইলেকট্রনিক সামগ্রীতে নানা ধরনের উপাদান থাকে। যেমন ক্যাডমিয়াম, লিড অক্সাইড, সিসা, কার্বন, সিলিকন, বেরিলিয়াম, ফাইবার গ্লাস, পারদসহ নানান ধাতব উপাদান। ইলেকট্রনিক সামগ্রী নষ্ট হয়ে গেলেও ঐ উপাদানগুলো নিঃশ্বেষ হয় না, ঐ বর্জ্যের মধ্যেই থেকে যায়। এগুলো পচনশীল নয় বিধায় পরিবেশের যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করে। ফলে মাটি, গাছপালা, ফসল ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। যে প্রভাবের কারণে জলবায়ুর পরিবর্তনও ঘটতে থাকে ধীরে ধীরে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুরোনো ইলেকট্রনিক সামগ্রী যখন ভাঙারির দোকানে স্থান পায়, তখন দোকানির প্রয়োজনে এই বর্জ্যগুলোকে রোদের তাপে শুকিয়ে নেয়। অথবা অনেকে বর্জ্যগুলোকে দোকানে না রেখে রাস্তার পাশে ফেলে রাখে। বিপদ তখনই ঘটতে থাকে। রোদের তাপে ‘ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট’ যেটি আমাদের কাছে আইসি নামে পরিচিত, তা থেকে মারাত্মক বিকিরণ নির্গত হতে থাকে। শুধু রোদেই নয়, এটি মাটির নিচে চাপা দিলে কিংবা পানিতে ফেলে দিলেও ক্ষতিকর বিকিরণ নির্গত হতে থাকে। শুধু তা-ই নয়, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এক চা-চামচ পরিমাণ পারদ ২০ একরের একটি জলাশয়ের পানি আজীবনের জন্য ব্যবহারের অনুপযোগী করে ফেলতে পারে। আর যত্রতত্র ফেলে রাখার কারণে ই-বর্জ্যের রেডিয়েশন রিসাইকেলের মাধ্যমে মানবদেহে দ্রুত প্রবেশ করে। পরবর্তীকালে মানুষের ত্বক, কিডনি, ফুসফুস, হূদ্যন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, যকৃত্, মায়েদের স্তন ও মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করে।

তাই এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে দ্রুত। ই-বর্জ্যের রেডিয়েশন-দূষণ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের খুব দ্রুত রিসাইক্লিং কারখানা গড়ে তুলতে হবে। যে কারখানায় ই-বর্জ্য প্রসেস করে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী যন্ত্রাংশ তৈরি করা যাবে। উল্লেখ্য, দেশে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং কারখানা হাতেগোনা কয়টি মাত্র, যা আমাদের উত্পাদিত ই-বর্জ্যের চেয়ে সংখ্যায় অপ্রতুল। অথচ ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং কারখানা হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পও। শিল্পটির বিস্তার ঘটলে দেশে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণমুক্ত হবে যেমন, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট রোধ হবে। আমরা তাই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি ই-বর্জ্যের মজুত ও প্রসেসিং নীতিমালা তৈরির জন্য। কামনা করছি, ই-বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য অন্তত প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ঝুঁকিমুক্ত ডামপিং স্টেশন নির্মাণে সব উত্পাদিত ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক কোম্পানিকে অর্থ বরাদ্দের জন্য সরকার বাধ্য করবে। পাশাপাশি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি পরিবেশ অধিদপ্তর ‘ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে সৃষ্ট বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা-২০১৮’ শিরোনামে পুরোনো বা ব্যবহূত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য। তাতে করে পরিবেশ বাঁচবে, দেশ বাঁচবে, অদৃশ্য দূষণ থেকে রক্ষা পাবে আমজনতাও।

n লেখক :পরিবেশবিদ