অপরাধ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী বলা যাবে না

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৩০

বিপ্লব বিশ্বাস

 

১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। অথচ এই দীর্ঘ দিনেও  দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীকে সেই বিদেশি ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী জনগণের সেবক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন,  সেখানে দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের আচরণ ও কথাবার্তায় জনগণের প্রভু হিসেবে পরিচয় দিতে চান! ২০১২ সালে হাইকোর্ট থেকে এক নির্দেশে বলা হয়েছিল যে, গ্রেফতার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটকের পর কোনো ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা যাবে না। মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘন। অথচ সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যাঁরা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত এবং যাঁদের সবচেয়ে বেশি আইন মেনে চলা প্রয়োজন, সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই আইনের প্রতি সবচেয়ে বেশি অবজ্ঞা প্রদর্শন করছেন। হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করেই গ্রেফতার করা ব্যক্তিদের গণমাধ্যমের সামনে শুধু হাজিরই করছেন না বরং তাদের অপরাধের বর্ণনা দিয়ে সমাজে এই আটককৃত ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবেই পরিচিত করাচ্ছেন। গণমাধ্যম ছাড়াও তাঁদের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ আটককৃত ব্যক্তির ছবি ও অপরাধের বিবরণ প্রচার করা হচ্ছে। অথচ আটককৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে প্রমাণ হলেই কেবল ঐ ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে।

দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে যে, কারো অভিযোগের ভিত্তিতে বা সন্দেহজনকভাবে বা প্রভাবশালীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে এনে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বা বিনা কারণেই ঐ ব্যক্তির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও চালানো হয়। অনেক উচ্চশিক্ষিত ও সম্মানিত ব্যক্তিকেও গ্রেফতারের সঙ্গে সঙ্গেই তুই-তোকারি করে কথা বলা, গালাগাল করে চড়, লাথি এমনকি লাঠি দিয়েও মারা শুরু হয়ে যায়। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে অনেক উচ্চশিক্ষিত ও মেধাবী তরুণ যোগ দিলেও তাঁদের পূর্বসুরিদের দেখানো সেই ঔপনিবেশিক আদর্শের পথেই তাঁরা চলছেন। আটককৃত ব্যক্তি যতোই শিক্ষিত, মেধাবী ও যোগ্যতা সম্পন্ন হোক না কেন, তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান দেখানো হয় না বরং তাদের সঙ্গে অত্যন্ত অমানবিক ও অভদ্র আচরণ করা হয়ে থাকে। অথচ চিহ্নিত সন্ত্রাসী, দাগী অপরাধী বা গডফাদারদের সঙ্গে এই বাহিনীর অনেক সদস্যেরই সখ্য দেখা যায়। এরা আটক হলেও এদের সঙ্গে বেশ ভালো ব্যবহারই করা হয়। অনেক সময় অদৃশ্য কারণে অনেক বড়ো অপরাধীকেও ছেড়ে দিতে দেখা যায়। এছাড়া যে সব কর্মকর্তার দ্বারা নির্দোষ, নিরপরাধ ব্যক্তি অযথা হয়রানি হচ্ছেন, অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে শিখিয়ে দেওয়া স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে, বিচারের আগেই অপরাধী বানিয়ে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে, সেই সকল দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সমাজে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে যেসব অসহায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণের বিধানও চালু করতে হবে। আর সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় আদালতকেই এগিয়ে আসতে হবে।   

আমাদের মনে রাখতে হবে, অপরাধীকে নির্যাতন করে বা শাস্তি দিয়ে অপরাধ দমন করা যায় না। অপরাধী যাতে পরবর্তী সময়ে আর অপরাধ না করে, সেদিকেই খেয়াল রাখা জরুরি। ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তে ভেজা স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা কোনো সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে এমন অমর্যাদাকর আচরণ আশা করতে পারি না।

ফরিদপুর