ভুতুরে জীবন

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ১৮:০১

 জামসেদুর রহমান সজীব

পৃথিবীতে ভূত বলে কিছু নেই। জীবনে ভূত না দেখলেও অদ্ভুত কিছু মানুষ দেখেছি। সেই অদ্ভুত মানুষের তালিকায় প্রথমেই থাকবে পিয়ালের নাম। যে কিনা ভূতের নাম শুনলেই ভাইব্রেশন মুডে চলে যায়। কাঁপতে কাঁপতে দাঁত-মুখ খিচে পড়ে যায় যখন-তখন।

এই পিয়ালের মতে, পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা কম, ভূতের সংখ্যা বেশি। ভূত নিয়ে ওর যত অভিজ্ঞতা আছে, তা নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানানো যাবে। শুধু কি একটি চলচ্চিত্র, আস্ত একটা ফ্রাঞ্চাইজি করা যাবে চলচ্চিত্রের। এমনকি লেখা যাবে মহাভারতের চেয়েও বিশাল কাহিনি। পিয়ালের প্রথম ভূত দেখার অভিজ্ঞতার গল্প এলাকায় সবচাইতে বেশি সমাদৃত। ছোটবেলায় নানাবাড়ি বেড়াতে গিয়ে এক মাঝরাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাঁশ বাগানে যায় পিয়াল। কিন্তু কর্ম সেড়ে উঠে আসতে পারেনি। তাকে নাকি ভূতে টেনে ধরে রেখেছিল। আর রাখবেই না কেন, বনে-বাদাড়ে ঝোপে-ঝাড়ে আকাম করে বেড়ালে কোন ভূতেরই বা মেজাজ ঠিক থাকবে? যদিও পিয়ালের নানাবাড়ির লোকজনের দাবি প্রাকৃতিক কাজ সেড়ে ওঠার সময় বাঁশের কঞ্চিতে পিয়ালের শার্ট আটকে গিয়েছিল, আর তাতেই ছেলেটা ভেবেছে ভূতে ধরে ঠেঙিয়ে দিয়েছে।

ভূত নিয়ে ছোট-বড়ো হাজারো এমন গল্প আছে পিয়ালের। তবে গল্প কোনো ব্যাপার না। কিন্তু ভূতের ভয় নিয়ে পিয়ালের যে জীবন, এ বড়ো বেদনার জীবন। যেমন ছেলেটা রাতে কখনো একলা ঘুমাতে পারে না। ধামড়া বয়সী একটা অবিবাহিত ছেলে একলা ঘুমাতে পারে না, বিষয়টা কতটা ভয়াবহ ভাবা যায়! এই একা না ঘুমানোর কারণে ছেলেটার কিছুদিন আগে চাকরিও চলে গেছে। অফিস থেকে কাজের সুবাদে বসের সঙ্গে কক্সবাজার ট্যুরে গিয়েছিল পিয়াল। সারাদিন মিটিং, সেমিনার শেষে রাত হওয়ার পর পিয়ালের কাঁপুনি উঠে যায়। বসের অমত থাকা সত্ত্বেও জোর করে তার সঙ্গে একই রুমে, একই বেডে ঘুমিয়ে রাত পার করে ছেলেটা। পরদিন ভূতের সঙ্গে জার্নি করার মতো ভয়ে ভয়ে ফিরে আসে কক্সবাজার থেকে। এমনকি ফিরে আসতে হয় চাকরিটা হারিয়েও! বিষয়টা অত উদ্বেগের না হলেও পরে যখন আমরা জানতে পারলাম সেই ট্যুরে আসলে বসের জায়গায় একই অফিসে কর্মরত বসের স্ত্রীর যাওয়ার কথা ছিল, তখন আমাদেরই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এসেছিল!

পিয়ালের এই ভূত-ভীতি নিয়ে বন্ধুমহলেও জল কম ঘোলা হয়নি। প্রায় সারাদিনই তান্ত্রিক-ওঝার আসরে কাটিয়ে সন্ধ্যায় পিয়াল এসে আমাদের দলে ভিড়ত। ওর গলা, কোমর, হাতে তাবিজ-কবজের অন্ত ছিল না। দুই হাতের দশ আঙুলে আংটি থাকত। ওকে দেখেই আমরা প্রথম জেনেছিলাম বুড়ো আঙুলেও আংটি পড়া যায়। তবে মুশকিল হলো, যখন আমাদের জন্যও তাবিজ-কবজ আর আংটি আনা শুরু করল পিয়াল। ওর কথা, যাদের সঙ্গে মেলামেশা তাদেরকেও ভূতে আছর করতে পারে। সে থেকে বাঁচতে আমাদেরকে তাবিজ পরতে হবে। সুকান্ত বাদে সবাই মেনেও নিয়েছিলাম। তাবিজ-আংটিকে ফ্যাশনের আওতায় ভেবে নিলাম আমরা। কিন্তু সুকান্ত খুব চটে গেল। এক কোনা থেকে শুরু করে পিয়ালের চৌদ্দগুষ্টিকে ভূত-ঝাড়া ঝেড়ে দিল সে। সবই ঠিক ছিল। তবে ভূতের দালাল বলায় পিয়াল ক্ষেপে গিয়ে সুকান্তের ঘাড়ে কামড়ে দিল। ওদের কামড়া-কামড়ি ছাড়াতে গিয়ে আমাদের নাজেহাল অবস্থা হলো। তার পরের এক সপ্তাহ পিয়ালকে বড়োপিরের মাজারে আর সুকান্তকে সদর হাসপাতালে রাখতে হয়েছিল।

মাস খানেক পরে আমাদের সবাইকে পিয়ালের বাসায় ডাকা হলো। আঙ্কেল-আন্টি জানালেন ছেলের বিয়ের কথা। এলাকার কোনো সুস্থ মানুষ তাদের পরিবারের মেয়েকে পিয়ালের হাতে দেবে না। আমাদেরকে অনুরোধ করলেন বাইরে খোঁজ করতে। পাগলের জন্য মেয়ে খুঁজতে হবে ভেবে আমাদের কলিজা শুকিয়ে এলো। কিন্তু আঙ্কেল-আন্টি যেই পরিমাণ বাজেট ঘোষণা করলেন, আমরাই পাগল হয়ে মেয়ে খুঁজতে নেমে গেলাম। পুরো এক মাস গরুখোঁজার মতো মেয়ে খুঁজে পিয়ালের বিয়ে দিয়ে দিলাম। ভাবলাম, এবার বুঝি ছেলেটা সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। লোকেমুখে তো শুনেছি, ঘরের বউকে নাকি ভূতেও ভয় পায়। কিন্তু হলো উল্টো। ভূতের ভয় তো গেলই না, সঙ্গে বউয়ের ভয় পিয়ালের হূদয়ে গেঁথে গেল। আরো বেশি মুশকিল হলো, যখন পিয়াল দাবি করে বসল তার বউয়ের ঘাড়ে ভূত আছর করেছে। বউয়ের পরিবার এসে আমাদের টুটি চেপে ধরল। আমরা কোনোরকম নিজেদের ছাড়িয়ে যে যার রাস্তা মাপলাম।

এরপর বছরখানেক কেউ আমরা পিয়ালের ধারে কাছে ঘেঁষিনি। হঠাত্ একদিন আমাদের দাওয়াত দেওয়া হলো যে, পিয়ালের ছেলে হয়েছে। আমরা কেউই বুঝলাম না যেই ছেলেটা দাবি করে তার বউয়ের ঘাড়ে ভূত আছর করেছে, সেই ছেলের আবার বাচ্চা কী করে হয়! শুধু এই রহস্যের ঘ্রাণেই আমরা দাওয়াত কবুল করলাম। নির্ধারিত দিনে পিয়ালের বাসায় গিয়ে দেখি ছোটখাটো ঘরোয়া আয়োজন। খাওয়াদাওয়ার পর্ব সেরে পিয়ালকে নিয়ে বাসার ছাদে গেলাম সবাই। জানতে চাইলাম রহস্য কী? পিয়াল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘আমার ছিল ভূতের ভয়। আর তোরা আমাকে পেত্নীর সাথে বিয়ে দিয়ে দিলি। রাতে আমি একলা ঘুমাতে পারতাম না। আর এখন আমার কারো সাথে ঘুমাতে হবে ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে! তোরা তো বিশ্বাস করলি না কিছু, ভূতেই আমার জীবনটা নষ্ট করেছে। জানিস আমার ছেলের জন্ম কবে হয়েছে? ৩১ অক্টোবর। এইদিন হলো ভূত দিবস! যেই আমি ভূতের ভয় পাই, সেই আমার ঘরেই এসেছে ভূতের বাচ্চা!’

পিয়ালের বয়ান শুনে আমরা সবাই থ হয়ে যাই। বলার মতো ভাষা খুঁজে পাই না। অবাক হবো নাকি রাগ হবো তারও কূল-কিনারা খুঁজে পাই না। সবাই চুপ। কেবল সুকান্তকেই দেখা গেল মুচকি মুচকি হাসতে। ঠিক মুচকি হাসিও না, শয়তানি হাসি। আর সেটা পিয়ালের চোখও এড়াল না। কিছুক্ষণ নিবিড়ভাবে খেয়াল করার পর হঠাত্ করেই পিয়াল গিয়ে সুকান্তের হাত কামড়ে দিল। অথচ ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েও হো হো করে হাসতে লাগল সুকান্ত। তা দেখে আমরা কেউ আর তাদের থামানোর সাহস পেলাম না। প্রথমবারের মতো আমাদের মনে হলো, ভূত আছে। আর তা আমাদের মাঝেই!