তৌহিদ আজিজ
জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের প্রধান আবু বকর আল বাগদাদির মৃত্যু সংগঠনটিকে কি আরো শক্তিশালী করে তুলবে? নাকি তার মৃত্যুতে সংগঠনটি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়বে? তার মৃত্যুর খবরে এ ধরনের প্রশ্ন এখন বিভিন্ন মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর বাগদাদিই তার হাল ধরেছিলেন। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠে শক্ত অবস্থানে আসা সত্যিই কঠিন বিষয়। আবার কেউ কেউ বলছেন, তার মৃত্যুর বদলা নিতে আইএস আগের তুলনায় আরো বেশি ভয়ংকর ও হিংস্র হয়ে উঠবে। এরই মধ্যে তার উত্তরসূরি এ ধরনের হুমকিও দিয়েছেন।
গত ২৭ অক্টোবর সিরিয়ার ইদলিবের বারিশা গ্রামে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর হামলার সময় বাগদাদি তার তিন সন্তানকে নিয়ে আত্মঘাতী হন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে আইএসের তরফ থেকে এ ধরনের খবরের সত্যতা স্বীকার করা হয়। বাগদাদির মৃত্যুর খবর নিয়ে প্রথমদিকে অনেক ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছিল। পরে আইএসের পক্ষ থেকে এ ধরনের খবরের সত্যতা স্বীকার করা হলে সেই ধোঁয়াশা অনেকটা কাটতে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাগদাদির মৃত্যুতে আইএস কি আরো ভয়ানক হয়ে উঠবে? বাগদাদির পর সংগঠনটি তাদের নতুন নেতার নাম ঘোষণা করলে এ আশঙ্কা আরো বাড়তে থাকে। সম্প্রতি তাদের নতুন নেতা হিসেবে আবু ইব্রাহিম আল-হাশেমি আল-কুরায়েশির নাম ঘোষণা করা হয়। এরপরই আইএসের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দেওয়া হয়। তারা বাগদাদি হত্যার উপযুক্ত বদলা নেবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন। আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোও বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে এক অডিওবার্তায় আইএস জানিয়েছে, ‘বাগদাদির মৃত্যুতে তোমরা আনন্দ কর না। তোমরা কি বুঝতে পারছ না যে আইএস আজ ইউরোপ আর আফ্রিকার কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। সুতরাং, আমরা এই হত্যার বিচার করব।’ অডিও বার্তায় আরো বলা হয়, ‘তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ না তোমরা হাসির পাত্র হয়েছ? তোমাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছে এক বোকা বুড়ো লোক। সে এক মতবাদ নিয়ে ঘুমাতে যায় আর ঘুম থেকে জেগে তার মতামত বদলে যায়।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রোগ্রামের পরিচালক লীনা বলেছেন, ‘বাগদাদির মৃত্যুতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইএসের অস্তিত্ব ধ্বংস বা সম্পূর্ণ পতন নিশ্চিত হবে না। বরং কাছাকাছি সময়ে সিরিয়ার স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে আইএসের এখনকার ভবিষ্যত্, তাতে দলটির নেতা থাকুক আর না থাকুক। কেননা আইএসের জন্য বাগদাদি একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। বিশেষ করে দলটি যখন একটি তথাকথিত রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করছিল।’ এ অবস্থায় আইএসের ভবিষ্যত্ নিয়ে এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাদের মতে, আইএসকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে অনেক কাঠখড় পোহাতে হবে। কেননা নেতৃত্বের শূন্যতা একটা বড়ো বিষয়। নতুন নেতা নির্বাচিত হলেও তিনি আইএসকে কতখানি ধরে রাখতে পারবেন সেটাও দেখার বিষয়। কেননা ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর সংগঠনটি শুধু পতনের দিকেই যাচ্ছে।
বাগদাদির মৃত্যুকে ঘিরে কিছু রাজনৈতিক ফায়দারও গন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মেয়াদের শেষ সময়ে এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছেন। অর্থাত্ বাগদাদির মৃত্যুর বাহবা নিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করবেন। যেমনটি করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তার সময়ে নিহত হয়েছিলেন ওসামা বিন লাদেন। আর তার কৃতিত্ব পুরোটাই গিয়ে পড়ে ওবামার ওপর। এবারও ডোনাল্ড ট্রাম্পও সেই পথে হাঁটলেন। তবে যত যাই হোক বাগদাদির মৃত্যু অবশ্যই বিশ্ব শান্তির জন্য একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোকে এর বাহবা কুড়িয়ে বসে থাকলে চলবে না। কেননা সাময়িক তারা (আইএস) নিশ্চুপ থাকলেও তাদের অস্তিত্বের জানান দিতে যে কোনো সময়ে আরো বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র : বিবিসি ও রয়টার্স
