প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে যেন আর খুনিদের রাজত্ব না হয়। যারা খুনি, সন্ত্রাসী, মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারী, তাদের হাতে যেন ক্ষমতা না যায়। দেশ উন্নয়নের যে গতিতে চলছে, তা যেন অব্যাহত থাকে। জনগণকে সেই খেয়াল রাখতে হবে। গতকাল রবিবার বিকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে শোকাবহ জেল হত্যা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তৃতায় তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের জেল হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারী ও মদতদাতাদেরও বিচার হবে। এই রহস্য উদ্ঘাটন হবে এবং ষড়যন্ত্রকারীরাও ধরা পড়বে।
কারাবন্দি খালেদা জিয়ার নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খুনিদের নিয়ে এত মায়াকান্না কেন? জেনারেল জিয়া একজন খুনি। তার স্ত্রী (খালেদা জিয়া) ও ছেলেও (তারেক রহমান) তাই। তারা (খালেদা জিয়া) শত শত মানুষকে হত্যা করেছে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে, বিরোধী দলে থাকতেও অগ্নিসন্ত্রাস চালিয়ে শত শত মানুষকে বীভত্স কায়দায় হত্যা করেছে। এতিমের টাকা আত্মসাত্ করার দায়ে দণ্ডিত হয়ে যিনি এখন কারাগারে, তাদের নিয়ে এত মায়াকান্না কেন? চিকিত্সা নিয়ে এত কথা কেন?’
বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করে শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘একটি দলের (বিএনপি) নেত্রী, যিনি এতিমের টাকা আত্মসাত্ করে দণ্ডিত হয়ে কারাগারে রয়েছেন। যাকে (তারেক রহমান) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন করা হলো, সে-ও দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত পলাতক আসামি! বিএনপি একজন ভালো লোককে পেল না দলের দায়িত্ব দিতে। তাই যারা এখন বিএনপি করেন, এত মায়াকান্না করেন, আসলে তাদের মেরুদণ্ড ও আত্মসম্মানবোধ আছে কি না, সন্দেহ হয়।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর খুনি, ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ড এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিচারের রায় আমরা কার্যকর করেছি। এদের যারা দোসর বা ষড়যন্ত্রকারী, হয়তো আমরা আজকে তাদের বিচার করে যেতে পারলাম না, আমরা করার চেষ্টা করব বা আগামীতে যারা আসবে তারা করবে। কারণ ইতিহাস কোনো দিন মুছে ফেলা যায় না। এই ষড়যন্ত্রকারীরাও একসময় ধরা পড়বে। কারণ ইতিহাস কাউকে কোনো দিন ক্ষমা করে না।’ সারাদেশে চলমান সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিইনি, দেব না। দেশের মানুষ যেন সুন্দর ও উন্নত জীবন পায়, সে জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’
বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্ষমতার পাঁচ বছরের দুঃশাসন এবং পরবর্তী সময়ে অগ্নিসন্ত্রাসের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের কিছু মানুষ আছে, তারা সহজেই অতীতের ঘটনা অল্প সময়েই ভুলে যান। এখন অনেকে কারাবন্দি দণ্ডিত একজনকে নিয়ে মায়াকান্না করেন। কিন্তু তাদের কি পঁচাত্তর-পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবার, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হত্যার পর তাদের পরিবার, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত ও পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকা এবং অগ্নিসন্ত্রাসে বীভত্স কায়দায় হত্যার শিকার পরিবারের আর্তনাদের চিত্র চোখে পড়ে না?’
খালেদা জিয়ার চিকিত্সা নিয়ে বিএনপির নেতাসহ কিছু মানুষের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘খালেদা জিয়া সেনাপ্রধানের স্ত্রী হিসেবে অনেক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমানও সেনাপ্রধান ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া তাকে সিএমএইচে চিকিত্সা পর্যন্ত নিতে দেননি। এখন তার চিকিত্সা নিয়ে এত কথা কেন? কোন মুখে তারা কথা বলেন?’
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউর রহমান জড়িত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে বেইমান-মোনাফিক খুনি মোশতাকের সঙ্গে জিয়াও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল বলেই খুনি মোশতাক জিয়াকে সেনাপ্রধান বানিয়েছিল। মোশতাকের পতনের পর জেনারেল জিয়া একাধারে সামরিক শাসক এবং রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমকে হটিয়ে অবৈধভাবে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। এই জিয়াই ক্ষমতায় এসে সংসদে ইনডেমনিটি আইন করেছিল।’
শহিদ জাতীয় চার নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারাগার হচ্ছে একটি সুরক্ষিত জায়গা। সেই কারাগারে বন্দিদের হত্যা করার মতো জঘন্য ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। খুনি খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। এর সঙ্গে আরো কারা জড়িত, সেটাও কিন্তু ইতিহাসে আছে। একদিন তাদেরও বিচার হবে।
আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, জাতীয় চার নেতা বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করে গেছেন। এটা শুধু এদেশে নয়, বিশ্বের জন্য বিরল দৃষ্টান্ত। সভায় আরো বক্তব্য রাখেন দলটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক, দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হক চৌধুরী নওফেল প্রমুখ। কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের পরিচালনায় আলোচনা সভার শুরুতেই ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর হত্যাকাণ্ডের শিকার জাতীয় চার নেতার স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
