অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রী ও একাত্তরে রণাঙ্গনের বীর গেরিলা যোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা আর নেই (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)। নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের বিশেষায়িত হাসপাতাল মেমোরিয়াল স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে স্থানীয় সময় রবিবার দিবাগত রাত ২টা ৫০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় গতকাল সোমবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিট) তিনি ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। মৃত্যুকালে পাশে ছিলেন স্ত্রী ইসমত আরা, ছেলে ইশরাক হোসেন, মেয়ে সারিকাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুর খবরে দেশে বিএনপি এবং দলটির অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোতে শোকের ছায়া নেমে আসে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহলও শোকাভিভূত। তার মৃত্যতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গভীর শোক জানিয়েছেন। এছাড়া শোক জানিয়েছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। পৃথক শোকবার্তায় বিভিন্ন দলের নেতারা খোকার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়ে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকার্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি জানান, সাদেক হোসেন খোকার পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান জানিয়েছেন, সাদেক হোসেন খোকার অন্তিম ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর তার লাশ যেন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২০১৭ সালে নবায়নের জন্য নিউ ইয়র্ক কনস্যুলেটে পাসপোর্ট জমা দিলেও অদ্যাবধি ফেরত না পাওয়ায় গত ১ নভেম্বর স্ত্রী ইসমত আরা কনস্যুলেটে আবেদনও করেন। কিন্তু কনস্যুলেট এ ব্যাপারে জানিয়েছে যে পাসপোর্ট নবায়নের বিষয়টি সরকারের ওপরমহলের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তবে কনস্যুলেট যে কোনো বাংলাদেশির দেশে ফেরার জন্য ট্রাভেল পাস ইস্যু করতে পারে। এদিকে মরদেহ ঢাকায় আনতে বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, সরকার বিষয়টিকে মানবিক হিসেবে বিবেচনা করবে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি আরো জানান, সাদেক হোসেন খোকা কিডনির ক্যানসারে ভুগছিলেন। তার মৃত্যুর খবরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ অনেক প্রবাসী গভীর রাতে হাসপাতালে ছুটে যান। তারা শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। অনেকেই ভেঙে পড়েন কান্নায়। ডা. ওয়াজেদ এ খান ইত্তেফাককে জানান, রাত ২টা ৫০ মিনিটে মারা গেলেও চিকিত্সকেরা রাত ৩টায় সাদেক হোসেন খোকাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত ১৮ অক্টোবর মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় তাকে ম্যানহাটনের মেমোরিয়াল স্নোয়ান ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে ভর্তি করা হয়। সেখানে গত এক সপ্তাহ তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন। চিকিত্সকেরা সাদেক হোসেন খোকার সুস্থ হয়ে ওঠার সব রকম আশা ছেড়ে দেন। এ কারণে হাসপাতালে যত লোক তাদের প্রিয় নেতাকে দেখতে গিয়েছেন, সবার সঙ্গে তিনি দেখা করেছেন। সবার কাছেই তিনি দোয়া চেয়েছেন।
সাদেক হোসেন খোকার পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী মাহমুদ হোসাইন বাদশা ইত্তেফাককে জানান, হাসপাতালে সাদেক হোসেন খোকাকে চিকিত্সকেরা তিন সপ্তাহ সময় দিয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তিনি জানান, স্ত্রী ইসমত আরা এবং বড়ো ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনসহ পরিবারের সদস্যরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর সাদেক হোসেন খোকার লাশ হিমঘরে রাখা হবে। স্থানীয় সময় সোমবার আসরের নামাজের পর জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে তার প্রথম জানাজা হতে পারে বলে জানান মাহমুদ হোসাইন বাদশা।
এদিকে রবিবার রাতে সাদেক হোসেন খোকাকে হাসপাতালে দেখতে যান যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান।
ক্যানসারের চিকিত্সার জন্য ২০১৪ সালের ১৪ মে সাদেক হোসেন খোকা সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে যান। রাজধানীর বনানী সুপার মার্কেটের কার পার্কিংয়ের ইজারা দুর্নীতির মামলায় গত বছরের ২৮ নভেম্বর ঢাকা বিভাগীয় স্পেশাল জজ মিজানুর রহমান খান খোকাসহ চার জনকে ১০ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। মামলা ও হুলিয়া মাথায় নিয়ে হলেও দেশে ফেরার জন্য ব্যাকুল ছিলেন তিনি। কিন্তু মৃত্যুর কাছে পরাজিত হয়ে অবশেষে লাশ হয়েই ফিরছেন একাত্তরে রণাঙ্গনের এই গেরিলা যোদ্ধা।
সাদেক হোসেন খোকা ১৯৫২ সালের ১২ মে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মাওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করে পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন এবং বিএনপির ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি হন সাদেক হোসেন খোকা।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী সাদেক হোসেন খোকা ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং তার দল সরকার গঠন করলে তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি মত্স্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি সরাসরি নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুলসহ বিএনপি নেতাদের শোক
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শোকবার্তায় মির্জা ফখরুল বলেন, মরহুম সাদেক হোসেন খোকা একজন জনঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশব্যাপী সুপরিচিত ছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ৭১-এর রণাঙ্গনে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য তার বীরোচিত ভূমিকা কিংবদন্তিতুল্য। তিনি ঐতিহাসিক যুগের সৃষ্টিকারীদের মধ্যে অন্যতম। মেয়র হিসেবে রাজধানী ঢাকার উন্নয়নে তিনি যে অবদান রেখেছেন সেজন্য ঢাকাবাসী তাকে চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তিনি ছিলেন দেশের একজন অগ্রগণ্য ক্রীড়া সংগঠক। শোকবার্তায় মরহুম সাদেক হোসেন খোকার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকার্ত পরিবারবর্গ, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান ফখরুল।
বিভিন্ন দলের শোক
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে বিকল্পধারা প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া, জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন এবং এলডিপি সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমদ (অব.) পৃথক শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেন। এছাড়াও শোক জানিয়েছেন, জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জাপার সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, খেলাফত মজলিসের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব ও সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুসহ অনেকে।
গোপীবাগের বাড়িতে তালা
সাদেক হোসেন খোকার আদি বসবাস পুরান ঢাকার গোপীবাগ ২য় লেনে। দুই ভাই ছয় বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। সম্প্রতি তার এক বোন মারা গেছেন। অসুস্থ এক বোন ঢাকাতেই আছেন। বাকি চার বোন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। একমাত্র ভাই উজ্জ্বল হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। বর্তমানে খোকার বাড়ি তালাবদ্ধ রয়েছে।
