বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে বায়ুদূষণকে চার নম্বরে দেখানো হইয়াছে ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল বার্ডেন ডিজিজ প্রজেক্টের প্রতিবেদনে। বলা হইয়াছে, বিশ্বে প্রতি বত্সর ৫৫ লক্ষের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে বায়ুদূষণের কারণে। চীনের ভয়াবহ বায়ুদূষণের কথা সকলেই কমবেশি অবগত। সম্প্রতি সর্বকালীন রেকর্ড গড়িয়াছে দিল্লির পরিবেশদূষণ। দিল্লি এবং তাহার আশপাশের এলাকাগুলির দূষণ সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ঘোরাফেরা করিতেছে ১২০০-এর কাছাকাছি—যাহা স্বাভাবিক মাত্রার হইতে প্রায় ২০ গুণেরও বেশি! এই দূষণের মধ্যেই গত রবিবার দিল্লির ফিরোজ শাহকোটলায় ভারত-বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে সমীহযোগ্য বিজয় অর্জন করিয়াছে বাংলাদেশ। চীনের ক্ষেত্রে আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়াছি, দূষণের ফলে সেই দেশটির কিছু শহরের অবস্থা এমন হইয়াছিল যে, কয়েকটি জায়গা সব সময় ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন থাকিত। বায়ুদূষণের কারণে মহাসড়ক বন্ধ রাখা, ফ্লাইট বাতিলের মতো ঘটনাও ঘটিয়াছে। বায়ুদূষণের কারণে ২০১৫ সালে চীনে বত্সরে ১১ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হইবার তথ্য মিলিয়াছে। এমন ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়িবার ফলে পরবর্তী সময়ে দেশটির সরকার দূষণ কমাইতে নানা উদ্যোগ গ্রহণের ফলে পরিস্থিতির উন্নতির আভাস পাওয়া যাইতেছে।
প্রশ্ন জাগিতেছে ঢাকার দূষণের পরিস্থিতি লইয়া? গত মে মাসে ঢাকা ছিল বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ দূষিত শহর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দারা বায়ুদূষণের প্রধান শিকার। সংস্থাটির হিসাবে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে বায়ুতে ক্ষতিকর বস্তুকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া সীমার দশ গুণের বেশি। পাকিস্তানের লাহোরের অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। সেইখানে ধোঁয়াশার মাত্রা এতটাই বাড়িয়া গিয়াছিল যে, বাড়ির বাহিরে যাইতে নিষেধ করিয়াছিলেন বিশেষজ্ঞরা। এইদিকে ২০১৭ সালে ২৬ হাজারেরও বেশি আফগানিস্তানবাসীর মৃত্যু হইয়াছে দূষণের কারণে। জঙ্গলে এবং জলাভূমিতে আগুনের জের ধরিয়া কালিমানতান ও সুমাত্রায় বায়ুদূষণের কারণে এক কোটি শিশু বিপদের মুখে। বাতাসে দূষণের নিরিখে গত জুন মাসে শীর্ষ স্থান অধিকার করিয়াছিল ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গিয়াছে, জাকার্তার বাতাসের মান এতটাই খারাপ যে একজন নাগরিকের জীবন হইতে গড়ে প্রায় আড়াই বত্সর আয়ুক্ষয় করিতেছে ঐ দূষিত বাতাস।
এইদিকে ঢাকা অত্যন্ত ঘন জনবসতিপূর্ণ রাজধানী বিধায় যানবাহনের ধোঁয়া ছাড়াও নির্মাণকাজ, ইটভাটা এবং কারখানার চিমনি হইতে প্রতিনিয়তই দূষিত হইতেছে শহরের বাতাস। আর শীত মৌসুমে তাহা আরো তীব্র হয়। অনেকের মতে, রাজধানীতে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই সরকারি হইবার কারণে উহাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। উন্নত দেশগুলিতে কোনো প্রকল্পের কাজে নামিবার পূর্বে প্রশমন পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রকল্প সমীক্ষায় দেখা হয় উহার পরিবেশগত প্রভাব। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও উন্নয়ন সূচকগুলি ঊর্ধ্বমুখী হইলেও পরিবেশগত দিকগুলি অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করা হইতেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য উন্নয়নের বিকল্প নাই বটে। তবে তাহা পরিবেশের বিষয়গুলি উপেক্ষা করিয়া নহে। আমরা তো আর দম বন্ধ করিয়া জীবন যাপন করিতে পারিব না, সুতরাং স্লো পয়জনের মতো বায়ু হইতে প্রবেশ করা এই বিষ হইতে রক্ষা করিতে হইবে সবাইকে।
