সোমেশ্বরীর বালু উত্তোলন ও পরিবহনে নৈরাজ্য

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:১৩

সোমেশ্বরীর বালু উত্তোলন নিয়ে চলছে লঙ্কাকাণ্ড। ধ্বংস হচ্ছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সদ্য নির্মিত আন্তঃজেলা হাইওয়ে সড়ক। এই নদী দুর্গাপুরের আশীর্বাদ হলেও এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, শুধু যত্রযত্র বালি উত্তোলন ও পরিবহনের কারণে। দুর্গাপুর পৌরবাসীসহ দুর্গাপুরে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সমস্যা হচ্ছে নানাবিধ।

শত শত ট্রাকে পরিবহনকৃত অতিরিক্ত ভেজা বালু পরিবহনে চরম হুমকিতে রয়েছে বিরিশিরি সেতুসহ নবনির্মিত শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কটিও। ভেজা বালু পরিবহনকে কেন্দ্র করে সড়কজুড়েই চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। তবে যত্রতত্র বালু উত্তোলন ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। অথচ দুর্গাপুরে বালুমহল ইজারা দিয়ে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে বছর প্রতি প্রায় ১৩ কোটি টাকা। এই টাকার কিছু অংশ খরচ করে বিকল্প সড়ক তৈরি করলে সব মহলেরই উপকার হতো বলে বিশিষ্টজনদের অভিমত।

নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা দুর্গাপুর। উপজেলাটিতে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ঘেরা সাদামাটির পাহাড়, সবুজবন, রানিখং মিশন, টং আন্দোলনের প্রতিকৃত রাশিমনি হাজং এর স্মৃতিসৌধ, রয়েছে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি সোমেশ্বরী নদী। যার মনোরম পরিবেশ ও সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে অনেক আগে থেকেই পর্যটকরা বেড়াতে আসেন এখানে। কিন্তু প্রায় একদশক ধরে নদীটির বুকে জেগে উঠেছে বিশাল বালুচর। আর বালুর নিচেই রয়েছে কয়লা ও পাথর। যা উত্তোলনের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে স্থানীয় বেশ কয়েকজন বালু ব্যবসায়ী হয়েছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ। আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হয়েছে সংঘর্ষ আর হানাহানি। পালটাপালটি হামলা মামলায় ঘটছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও। নদীতে বালু ঘাট ইজারা দিয়ে প্রতিবছর কোটি টাকা রাজস্ব আয় হলেও যত্রতত্র বালু, পাথর উত্তোলন ও পরিবহনের ফলে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পৌরবাসী। দেশের সবচেয়ে ভালো মানের বালু হওয়ায় এর চাহিদা রয়েছে বেশ। দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই পৌর শহর জুড়ে নদীর বিভিন্ন অংশেই চলছে বালু, পাথর উত্তোলন ও ভেজা বালু পরিবহন। বিকল্প কোনো সড়ক না থাকায় পৌর শহরের ভেতর দিয়ে চলাচল করে অতিরিক্ত বালু বোঝাই কয়েক হাজার ট্রাকলরি।

সড়কে সৃষ্টি হয় তীব্র যানযট। এক কথায় শহরের অভ্যন্তরীণ সবগুলো সড়কই এখন বালু ব্যবসায়ীদের দখলে। ট্রাকলরির বেপরোয়া চলাচলের কারণে চরম আতঙ্কে থাকেন স্থানীয়রা। সড়কটির বিভিন্ন অংশে বাজারসহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও নেই কোনো গতিরোধক ব্যবস্থা। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা।

নেত্রকোনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দিদারুল আলম তরফদার বলেছেন, ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সড়কটি এখন ভিজা বালি পরিবহনের কারণে বিনষ্ট হবার পথে। কারণ যানজটের কারণে যখন বালিবাহী ট্রাকগুলো সড়কে অবস্থান করে তখন পানি পড়ে সড়ক বিনষ্ট হচ্ছে। তাই বালি পরিবহনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা খুব জরুরি। তিনি আরো জানান, এদিকে সড়কটির বিভিন্ন গতিরোধক স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

দুর্গাপুর পৌরসভার মেয়র হাজী মৌলানা আব্দুস ছালাম বলেন, যেহেতু উন্নয়ন এবং নির্মাণকাজে দুর্গাপুরের বালির কোনো বিকল্প নেই, তাই এই বালু পরিবহন করতে হবে। কিন্তু এতে করে পৌরসভা সড়কের পাশাপাশি হাইওয়ে সড়কটিও বিনষ্ট হচ্ছে। দুর্গাপুর থেকে বালি পরিবহনে বিকল্প সড়ক নির্মাণের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য মানু মজুমদারের সঙ্গে কথা হয়েছে। পৌরসভার বাইরে দিয়ে একটি বিকল্প সড়ক নির্মাণের জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস প্রদান করেছেন বলেও জানান মেয়র।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম বলেন, জনদুর্ভোগ নিরসনে পৌর শহরের মধ্য দিয়ে অতিরিক্ত ভেজা বালু পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও যত্রতত্র বালু উত্তোলন বন্ধে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন। তিনি জানান, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে এসব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বেপরোয়া গাড়ি চালনা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে অচিরেই কঠোরভাবে ট্র্যাফিক আইন প্রয়োগ করা হবে বলে জানান জেলা পুলিশ সুপার আকবর আলী মুনসী।