দখল :এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতি

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ২০:৫৩

আমাদেরই চারিপাশে আমরা একটি দৃশ্য দেখিতে পাই। ছোট্ট একটি পান-বিড়িসমেত বাক্স লইয়া একজন ব্যক্তি রাস্তার খানিকটা দখল করিয়া বসিয়াছে। পুলিশ আসিল, যত দ্রুত সম্ভব তাহার বাক্স-প্যাটরা লইয়া দৌড় দিল। পুলিশ চলিয়া গেলে আবার আসিয়া বসিল। ইহা একটি ক্ষুদ্র দখলের চিত্র। অনেকটাই নিরপরাধ দখল। কিন্তু এই দখল হইতে শুরু করিয়া আমরা নদী, খাল, জলাশয়, স্কুলের মাঠ, বৃহত্ ভবন, খাসজমি; রেলওয়ের, বিআইডব্লিউটিএর, বন বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের জমি এবং স্থাপনা অবৈধভাবে দখল হইতে দেখিয়া থাকি। এমনকি এক বিভাগের সম্পদ বা জমি আরেক বিভাগের দখলের নজিরও রহিয়াছে। পান-বিড়িওয়ালার দখলের সঙ্গে এইসব দখলের একটি মৌলিক পার্থক্য রহিয়াছে। পান-বিড়িওয়ালা মোবাইল দখলদার। অর্থাত্ এক জায়গা হইতে দৌড় দিয়া আরেক জায়গা বসিয়া পড়িল। কিন্তু যাহারা সরকারের মূল্যবান সম্পদ, জমি, স্থাপনা দখল করিতেছেন তাহারা স্থায়ী দখলদার।  পান-বিড়িওয়ালা যাহা করিতেছেন তাহা নিতান্তই পেটের দায়ে। আর জমি, স্থাপনা যাহারা দখল করিতেছেন তাহারা লালসায়! বর্তমানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দখলের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান চালাইতেছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু আধটু উদ্ধার হইতেছে। ইহা ভালো খবর। কিন্তু কতটা দখলমুক্তি সম্ভব?  এই ঢাকা শহরেই ছিল অনেক খাল-বিল, ছিল খাসজমি, যাহা কেবল দখল করিবার কারণে অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। গড়িয়া উঠিয়াছে অট্টালিকা, শিল্পকারখানা। ঢাকার মানচিত্রই পালটাইয়া গিয়াছে। পুরাতন দখলগুলি তো রীতিমতো ‘হালাল’ হইয়া গিয়াছে। পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে যেই সকল দখল হইয়াছে তাহা এখন উদ্ধার করিতে যাইবে কে? অন্যদিকে দেশে বহুকাল ধরিয়াই চর দখলের একটি কালচার রহিয়াছে। নিয়ম হইল, নদীর এক কূল ভাঙিয়া অন্য কূল গড়িয়া উঠিলে ভাঙিয়া যাওয়া কূলের বৈধ মালিক অন্যকূলে বসত গড়িবে। কিন্তু নতুন চর জাগিয়া উঠিলে উহা লাঠিয়াল ব্যবহারের মধ্য দিয়াই সমাধান হয়। যেই দলের লাঠিয়াল জিতিল, সেই দল জায়গার দখল লইল। আইন, নিয়মকানুন বা দলিল দস্তাবেজের বালাই নাই।

ইহাই প্রকৃত অর্থে চলিতেছে আমাদের যাপিত জীবনে। অবৈধ দখল একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হইয়াছে। এই সংস্কৃতি নতুন নহে। দখল ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের শক্তির বহিঃপ্রকাশও। আমাদের সমাজে বহু মানুষের ধারণায় রহিয়াছে, উপরে উঠিবার, প্রতিষ্ঠিত হইবার সহজ পথ হইল অবৈধ দখল। কেবল বাংলাদেশে নহে, এই দখলের প্রবণতা আমরা বিভিন্ন দেশে দেখিতে পাই। আমরা বহু দেশে বহুবার আস্ত রাষ্ট্রই তো দখল করিয়া ফেলিতে দেখিতেছি। সেই দখল কখনো বহিঃশক্তি করিয়া থাকে, কখনো করিয়া থাকে অভ্যন্তরীণ কোনো শক্তি।  উহা  কখনো অবৈধ দখল হয় অস্ত্রের মুখে, আবার কখনো হইয়া থাকে ভোটকেন্দ্র দখলের মধ্য দিয়া। বর্তমানে আফ্রিকার ১৭টি দেশে যেই সকল স্বৈরশাসক বসিয়া আছেন, তাহাদের অনেকেই একটি আনুষ্ঠানিক ভোট করিয়া থাকেন মাত্র। তবে সর্বোপরি মনে রাখিতে হইবে, যেই দেশে পান-বিড়িওয়ালা রাস্তা দখল করেন না, যেই দেশে মানুষের লোলুপ দৃষ্টি নদী-খালের উপর পড়ে না, সেই রকম দেশ বহিঃশত্রু অথবা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতালোভী কেহই দখল করিতে পারে না। ইহার উদাহরণ  ব্রিটেন, জার্মানির মতো দেশসমূহ।  সুতরাং গোটা জাতির মানসিকতা পরিবর্তন এখন অপরিহার্য হইয়া পড়িয়াছে। এই মানসিকতার পরিবর্তন হইলে ভবিষ্যত্ বাংলাদেশে না হইবে নদী দখল, না ঘটিবে বিগত দিনের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল।