দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের গুণী পরিচালক ও অভিনয়শিল্পী আমজাদ হোসেন আর নেই। গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ সময় দুপুর তিনটার দিকে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
প্রয়াত পরিচালকের বড় ছেলে সাজ্জাদ হোসেন দোদুল ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে দোদুল ব্যাংককের পথে রয়েছেন। যাওয়ার আগে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সময় ২ টা ৫৭ মিনিটে বাবা মারা গেছেন। ব্যাংককে পৌঁছানোর পরই মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে তিনি জানান। চলচ্চিত্রের এই গুণী নির্মাতার চিকিত্সার সব দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি উদ্যোগে উন্নত চিকিত্সার জন্য তাকে ২৭ নভেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হয় ব্যাংককের হাসপাতালে। এর আগে ১৮ নভেম্বর সকালে নিজ বাসায় ঘুমের মধ্যে ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হন আমজাদ হোসেন। পরে তাকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আমজাদ হোসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, তথ্যপ্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম প্রমুখ।
সৃজনশীলতার নানা মাধ্যমে কাজ করেছেন আমজাদ হোসেন। শিশুসাহিত্যিক, উপন্যাসিক, চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্য রচয়িতা, গীতিকার, অভিনেতা এরকম নানা পরিচয়ে তিনি পরিচিত। গুণী এই পরিচালক ১৯৭৮ সালে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ এবং ১৯৮৪ সালে ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। শিশুসাহিত্য রচনার জন্য তিনি ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে দুইবার অগ্রণী শিশুসাহিত্য পুরস্কার এবং ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ একাধিক রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। তাঁর নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘বাল্যবন্ধু’, ‘পিতাপুত্র’, ‘বাংলার মুখ’, ‘নয়নমণি’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘গোলাপী এখন ঢাকায়’, ‘গোলাপী এখন বিলেতে’ প্রভৃতি।
আমজাদ হোসেন ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় এসে সাহিত্য, অভিনয় ও নাট্যচর্চার সঙ্গে জড়িত হন। প্রথমেই তিনি অভিনয়ে নিজেকে তুলে ধরেন মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে। নিজের লেখা নাটক ‘ধারাপাত’ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। এরপর জহির রায়হানের ইউনিটে কাজ শুরু করেন। এভাবেই দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে ১৯৬৭ সালে তিনি নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। ‘জুলেখা’ ছবিটি তার প্রথম কাজ। ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান ও আমজাদ হোসেন মিলে নির্মাণ করেন কালজয়ী ঐতিহাসিক ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’।
শুরু থেকেই সাহিত্যচর্চায় নিমগ্ন ছিলেন আমজাদ হোসেন। তার প্রথম কবিতা ছাপা হয় পশ্চিমবঙ্গের ‘দেশ’ পত্রিকায়। লিখেছেন উপন্যাস— ধ্রুপদী এখন ট্রেনে, দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভালোবাসা, যুদ্ধে যাবো ; জীবনীগ্রন্থ— মাওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি, কিশোর উপন্যাস—জন্মদিনের ক্যামেরা, যাদুর পায়রা প্রভৃতি। এছাড়া ছোটদের জন্য তিনি অসংখ্য ছড়া ও গল্প লিখেছেন। তিনি কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্র আন্দোলন নিয়ে ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থও রচনা করেছেন।
আমজাদ হোসেন অনেক বিখ্যাত সব গানের গীতিকার। এর মধ্যে রয়েছে: ‘আছেন আমার মোক্তার, হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ, কেউ কোনোদিন আমারে তো কথা দিলো না, একবার যদি কেউ ভালোবাসতো ইত্যাদি ।
আমজাদ হোসেন প্রথম জীবনে অভিনয় করেছেন। পরবর্তীতে চলচ্চিত্র পরিচালনার মনোনিবেশ করলেও আবার অীভনয় করতে শুরু করেন একটা সময়ে। ৮০’র দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঈদের নাটক বলতেই ছিল আমজাদ হোসেনের লেখা, পরিচালনায় ও অভিনয়ে ‘জব্বার আলী’ নাটকটি। যা সেইসময়ে বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পায়। আমজাদ হোসেন নিজেই অভিনয় করেছেন জব্বার আলী চরিত্রে।
আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা আমজাদ হোসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে যাদের অবদান অনুকরণীয় তাদের মধ্যে আমজাদ হোসেন ছিলেন শীর্ষস্থানীয়। একুশে পদকপ্রাপ্ত এই গুণী শিল্পীর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়ে মন্ত্রী মহান আল্লাহতায়ালার কাছে বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
