টেনে নামানোর প্রতিযোগিতা

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ২১:২৭

বাঙালি চরিত্রের অন্যতম সমালোচিত বিষয় হচ্ছে একজনের প্রতি আরেকজনের ঈর্ষা। এদেশের মানুষ কীভাবে এটা পেল, কীভাবে তা সকলের হাড়-মজ্জায় মিশে গেল সেটা এক আশ্চর্য ধাঁধা। এদেশের মানুষ কেউ কারো ভালো দেখতে পারে না। অকারণেই একজন আরেকজনকে ল্যাং মারে, পেছন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। বলা হয়ে থাকে, বাঙালিদের জন্য নরকে নাকি কোনো পাহারাদারের দরকার হয় না। কেউ যদি প্রাচীর বেয়ে নরক থেকে পালাতে যায়, তবে অন্যরা পা ধরে টেনে নামিয়ে ফেলে। এতে করে কেউ-ই পালাতে পারে না। মুক্তিও পায় না। এ ব্যাপারে নানা ধরনের গল্প প্রচলিত আছে। এর একটি উল্লেখ করা যাক।

একবার এক সন্ন্যাসীর শখ হলো তিনি স্বর্গ ও নরক দেখবেন। মহান ঈশ্বর তার প্রার্থনা পূরণ করলেন। তিনি সে অনুযায়ী প্রথমে গেলেন স্বর্গে, তারপর নরক দেখতে বের হলেন। ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় গিয়ে দেখলেন, একদল লোক ভয়াবহ রকম আগুনে পুড়ছে। তাদের ঘিরে রয়েছে অসংখ্য পাহারাদার। তিনি স্বর্গের এক দূতকে বললেন, এরা কারা, আর চারপাশে কেন এত পাহারা?

সেই স্বর্গের দূত বললেন এরা ঈশ্বরে খুব একটা বিশ্বাস করে না। তাই এই চরম শাস্তির ব্যবস্থা।

সন্ন্যাসী জিগ্যেস করলেন, চারপাশে এত পাহারা কেন?

দূত বললেন, এরা যেন একজন আরেকজনের কাঁধে উঠে পালাতে না পারে তাই এই ব্যবস্থা।

এমনি করে যেতে যেতে তিনি হঠাত্ দেখলেন একদল লোক জ্বলছে কিন্তু তাদের চারপাশে কোনো পাহারা নেই! সন্ন্যাসী বাবা অবাক হয়ে আবার স্বর্গের দূতের সন্ধান করলেন। তাকে পেয়ে জিগ্যেস করলেন, এরা কারা?

দূত অবজ্ঞা ভরে বললেন, এরা বাঙালি। এরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী হলেও সব রকম অপকর্মই করত। তাই তাদের জন্য এই শাস্তি।

সন্ন্যাসী আবারও জিগ্যেস করলেন, কিন্তু এদের চারপাশে কোনো পাহারা নেই কেন? সন্ন্যাসীর এমন প্রশ্নে স্বর্গের দূত হেসে বললেন, এদের চারপাশে পাহারা লাগে না। এরা একজন উঠতে গেলে আরেকজন টেনে ধরে!

কাঁকড়ার সঙ্গে আমাদের স্বভাবে আশ্চর্য মিল আছে। একটা পাত্রে কয়েকটি কাঁকড়া রাখার পর যদি পাত্রটির মুখ খোলাও রাখা হয়, তবু কাঁকড়ারা পালাতে পারে না। কারণ একটা কাঁকড়া যদি ওপরে ওঠার চেষ্টা করে, বাকিরা টেনে নিচে নামিয়ে ফেলে।

আমরা অপরকে টেনে নামাই। নিজেও খাদেই পড়ে থাকি। এই প্রবণতা কমবেশি সবখানেই দেখা যায়। এখানে আরেকজনকে ফাঁসাতে কেউ কেউ নিজের সন্তানকে পর্যন্ত খুন করে ফেলেন। আমরা রাস্তাঘাটে দেখি, কে কাকে ধাক্কা মেরে, পেছনে ফেলে নিজে এগিয়ে যাবে—তারই প্রতিযোগিতা চলে। আমাদের এখানে রাজনৈতিক দল, সরকারি বেসরকারি সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ধর্মপ্রতিষ্ঠানে পর্যন্ত সবখানে গুঁতোগুতি, ঠ্যালা-ধাক্কা ও ল্যাং মারামারির অভিন্ন দৃশ্য লক্ষ করা যায়।

এখানে পরিবারে, অফিসে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের, উপাসনালয়ে, আড্ডায়, টকশোতে সবখানে কেবল দলাদলি, অনৈক্য ও বিভক্তি। প্রত্যেকের আলাদা কর্মসূচি, আলাদা এজেন্ডা আছে ঠিক। কিন্তু সবার চূড়ান্ত লক্ষ্য যেন অপরকে ল্যাং মারা। জব্দ করা। ধাক্কা মেরে খালে ফেলে দেওয়া।

সম্প্রতি রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দীন আহম্মেদকে টেনে-হিঁচড়ে পুকুরে ফেলে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অধ্যক্ষের অভিযোগ, অন্যায় দাবি না মানায় ক্ষুব্ধ হয়ে একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই কাজ করেছেন।

ঘটনাস্থলে থাকা ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, অন্তত ১০ জন তরুণ অধ্যক্ষকে দ্রুতগতিতে পুকুরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ তার হাত ধরে টানছিলেন, আবার কেউ পেছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছিলেন। এরপর তাকে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।

ঘটনার ব্যাপারে অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দীন আহম্মেদ বলেন যে, বিভিন্ন সময় কিছু ছাত্রনেতা তার কাছে অন্যায় দাবি নিয়ে আসত। তাদের দাবিগুলো মানার মতো না। দাবি না মানার কারণে তারা অধ্যক্ষের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। ক্লাসে উপস্থিতি কম থাকায় দুজন ছাত্রের ফরম পূরণ হয়নি। তাদের ফরম পূরণ করানোর জন্য কয়েকজন অধ্যক্ষের কাছে আসে। অধ্যক্ষ তাদের বিভাগীয় প্রধানের কাছে যেতে বললে অশালীন মন্তব্য করে তারা। এরপর অধ্যক্ষ মহোদয় দুপুরে নামাজ পড়ে অফিসে যাওয়ার সময় একজন তার পথ আটকে পুকুরের দিকে যেতে বলে। অধ্যক্ষ যেতে না চাইলে তারা তাকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে পুকুরে ফেলে দেয়। এরপর তারা পালিয়ে যায়।

অধ্যক্ষ আরো বলেন, ‘যেখানে আমাকে ফেলেছে সেখানে পানির গভীরতা ছিল ১২ থেকে ১৫ ফুট। সাঁতার জানতাম বলে আমি বেঁচে গেছি। সাঁতার না জানলে হয়তো আজই মারা যেতাম।’

অধ্যক্ষ মহোদয়ের অনুতাপ করার কিছু নেই। এর চেয়েও খারাপ কিছুও ঘটতে পারত। ঐ ছাত্ররা অধ্যক্ষের গলা টিপে ধরতে পারত। গুলি করতে পারত। কুপিয়ে-পিটিয়ে মেরে ফেলতেও পারত। তা না করে ভরা দুপুরে গরমকালে পুকুরে ফেলেছে। এতে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। আগের আমলে শিক্ষার্থীরা গুরুগৃহে গিয়ে লেখাপড়া করত। লেখাপড়ার পাঠ শেষ হলে তারা পুকুরে স্নান করে ‘স্নাতক’ হতো। অধ্যক্ষ মহোদয়কেও ছাত্ররা পুকুরে স্নান করিয়ে ‘স্নাতক’ বানিয়েছেন। যারা এমন মহান কর্ম করেছেন, তাদের সবাইকে রাষ্ট্রীয় পদক দেওয়া উচিত। তারা ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের সনাতন ধারা ভেঙে এক নতুন ‘রোমান্টিক’ ধারা প্রবর্তন করেছেন। শিক্ষককে টেনে-হিঁচড়ে পুকুরে নিয়ে যাচ্ছেন, ধাক্কা দিয়ে পুকুরে ফেলে দিচ্ছেন! সেই বাল্যকালের কথা মনে পড়ে যায়। বর্ষাকালে আমরা দল বেঁধে পুকুরে গোসল করতাম। আমাদের যে বন্ধু পুকুরে নামবে না, আমরা তাকে জোর করে ধরে পুকুরে নিক্ষেপ করতাম! আমরা কৈশোরে বন্ধুদের সঙ্গে যা করতাম, কিছু ছাত্রনেতা এখন অধ্যক্ষের সঙ্গে তা-ই করছে। আহ্ ছাত্রনেতাগণ! হাউ সুইট দে আর!

অধ্যক্ষ মহোদয়ও বেশ খানিকটা বাড়াবাড়ি করেছেন। ক্লাসে উপস্থিতি কম থাকায় দুজন ছাত্রের ফরম পূরণ হয়নি। ছাত্রনেতারা এই দুজন শিক্ষার্থীর ফরম পূরণের সুযোগ চেয়েছেন। স্বার্থপরতার এই যুগে ছাত্রনেতারা এই দুই শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে। অধ্যক্ষ মহোদয়ের বরং উচিত ছিল এই শিক্ষার্থীদের উপযাচক হয়ে ফরম পূরণের সুযোগ করে দেওয়া। তিনি সেটা না করে অমানবিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। এমন অধ্যক্ষের মনের কালিমা দূর করতে পুকুরে চুবানোটাই প্রকৃত দাওয়াই। ছাত্রনেতা-কর্মীরা ঠিক কাজটিই করেছেন। যে অধ্যক্ষ এমন ছাত্রনেতাদের কথা শোনে না, নিয়মের দোহাই দিয়ে শিক্ষার্থীদের ফরম-ফিলআপ আটকে দেন, তাকে শুধু পুকুরে নয়, বরং বঙ্গোপসাগরের লোনা জলে চোবানো উচিত!

আসলে আমরা কেউ অন্যের ভালো দেখতে পারি না। শিক্ষকও না, শিক্ষার্থীরাও না। না হলে শিক্ষকরা ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে ফরম পূরণের সুযোগ দেবেন না কেন? ক্লাস করে কী এমন উপকার হয়? তা ছাড়া কারো ক্লাস ভালো না-ই লাগতে পারে। ক্লাসে উপস্থিত থাকা না-থাকাটা শিক্ষার্থীদের ইচ্ছে ও স্বাধীনতার ব্যাপার। কারো স্বাধীনতায় নিশ্চয়ই হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। এটা কি ঐ অধ্যক্ষ জানেন না?

আসল কথা হচ্ছে, একজন আরেকজনের পিছে লাগাটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই আরেকজনের সর্বনাশ। একজনের সুন্দর একটা টিনের ঘর আছে, দূর থেকে মারো একটা ঢিল। একজনের বাগানে সুন্দর ফুল ফুটেছে, কোনো এক রাতের অন্ধকারে গিয়ে গোপনে সেই ফুলগাছগুলো কেটে দাও। কারো পুকুরে অনেক বড়ো বড়ো মাছ রয়েছে। গোপনে দাও বিষ মিশিয়ে। কেউ সাফল্যের পথে এগিয়ে চলেছে, দাও তাকে ল্যাং, যদি না পারো তবে দাও তার নামে কলঙ্ক রটিয়ে।

এভাবে অন্যজনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া, ল্যাং মারাটা আমাদের জাতীয় স্বভাবে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তির একটা মাত্র পথ আছে। অবশ্য সেটা এ জাতি গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কেননা এপথ গ্রহণের জন্য যতটুকু মানসিক শক্তি, সাহস ও উদ্যম প্রয়োজন তা এ জাতির মধ্যে অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। যদি তাদেরকে বলা হয় যে, আপনারা একে অপরকে পেছন থেকে টেনে ধরার সংস্কৃতি বাদ দিন, অন্যের জন্য পথ ছেড়ে দিন, সে আগে যাক, তারপর আপনি যান। এখানেও প্রশ্ন আসবে শুরুটা করবে কে? আপনি এত মহান তাহলে আপনি আগে শুরু করুন!

অনেকে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলতে পারেন : আমার নিজের পাঁঠাটিকে, কাটব আমি লেজের দিকে, তাতে কার বাবার কী?

n লেখক : রম্যরচয়িতা