নারী, মা, তনয়া, ভগিনী, স্ত্রী শব্দগুলোর ভাবার্থ ভিন্ন ভিন্ন হলেও শব্দগুলো যে সমগোত্রীয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নারী ছাড়া এই পার্থিব জগত্ অন্ধকারময়। নারী হলো এ ধরণির সৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক। অথচ নারীকে বরাবরই পুরুষের চেয়ে ছোটো করে দেখা হয়। সেটার পার্থক্য আমরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অহরহ দেখতে পাই। সমাজের ধারণা— বিদ্যা, বুদ্ধি, শক্তিতে পুরুষ নারীর চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। অথচ তারা ভাবে না পুরুষের মতো নারীরা যদি সমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বেড়ে ওঠে তবে নারী ও পুরুষের মতো সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। দেশ ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি শিশুর জন্মের পর থেকে সমাজব্যবস্থা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ধরুন নারী ও পুরুষকে দুটি আলাদা জগতে ভাগ করে দেওয়া হয়। সেভাবেই তারা বেড়ে ওঠে। কারণ জন্মের পর শিশুটি জানে না সে ছেলে না মেয়ে, তার পোশাক কেমন হবে, সে কতটা হাসবে, কাঁদবে, কোথায় যাবে, থাকবে, কম খাবে না বেশি খাবে, তার চলাফেরা, জীবনবোধ, আদর্শ, ধর্ম কেমন হবে। সন্তান জন্ম দেওয়া, ঘর সামলানো চার দেওয়ালের গণ্ডিতে নিজেকে অহর্নিশ আবদ্ধ হয়ে জলাঞ্জলি দেওয়া, এটাই কি নারীর জীবন? আজকের পৃথিবীর যত উন্নয়ন তা এককভাবে পুরুষের অবদানের ফসল নয়, নারীরা সবসময় পুরুষের পাশে থেকে সাহায্য করেছে। তাই নারীকে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে নারীদের অবস্থা আগের থেকে উন্নত হলেও সার্বিকভাবে নারীদের তেমন কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি। নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও তার গুণগত উন্নয়ন তেমন দেখা যায় না। তার পেছনে আমাদের নারী সমাজের কিছু কৌশল বা যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। নারীদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মানসিকভাবে দৃঢ় ও যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার জন্য নিজেদের অনেক কৌশলী হতে হবে। নারীদের বুঝতে হবে শুধু বিয়ের পাত্রী হয়ে বেঁচে থাকা নারী জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। নারীকে যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ হয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করতে হবে। নারীর পরিচয় শুধু কারো মেয়ে, বউ বা মা হিসেবেই নয়, নারীর নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে হবে। নিজের জীবনের উন্নয়ন নিজেকেই করতে হবে। তাই নারী সমাজকে দক্ষতার ও কৌশলের সঙ্গে নিজেদের পরিচিত হতে হবে।
আমাদের নারী সমাজের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা এমন যে, আমার গুণগুলো এত বলার কি আছে? লোকে আমার কাজের মাধ্যমে আমাকে চিনবে, অর্জনগুলো দাবি করার কি আছে? নিজের গুণগুলো যদি নিজে প্রকাশ না করো তোমার দক্ষতা যাচাই করা বা খোঁজ নেওয়া তো অন্যজন করে দেবে না। নিজেকে নিজের দক্ষতাগুলো খুঁজে বের করতে হবে।
নারীকে নিজের কাজ নিজে করার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। পুরুষের ওপর নির্ভর করা হীনমন্যতার পরিচয় আর সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পুরুষ নারীকে দাসী বানিয়ে রাখে। তাই পুরুষের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। নারীকে স্বাবলম্বী হয়ে নিজেকে যোগ্যতম স্থানে নিয়ে যেতে হবে। নারীর অংশগ্রহণ এখন সর্বত্র। বাংলাদেশের পোশাক কারখানার রপ্তানির সিংহভাগ আসে নারীদের একনিষ্ঠ শ্রমের বিনিময়ে। তাই নারীকে বিভিন্ন পেশায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের বেতন, নিরাপত্তার ন্যায্য অধিকারের ব্যবস্থা করতে হবে।
নারীকে বিশ্বের সঙ্গে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আমাদের নারী সমাজ আজ উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। নারীরা আজ তাদের যোগ্যতাবলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারিং, পাইলট, ব্যবসা, গবেষণা কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। তাই নারীকে মানসিকভাবে দৃঢ় মনোবল এবং যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। শুধু ঘরকন্না বা বিয়ের পাত্রী হয়ে জীবন কাটানো নারীর কাম্য নয়। তাই সকল নারীকে যোগ্য ও দৃঢ়চেতা হয়ে গড়ে উঠতে হবে। পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভূমিকায় দেশ হয়ে উঠবে অনন্যা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
