গত কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগের বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও এতে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়া ও উচ্চ ব্যয়কে এর পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিও (ডিসিসিআই) গতকাল এই ইস্যুতে কথা বলেছে। এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং ব্যবসায়ের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর ফলে অপেক্ষাকৃত ছোটো ব্যবসায়ীরা বেশি চাপের মুখে পড়ছে। ব্যবসায়ের খরচ বেড়ে যাওয়ার পেছনে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি হওয়াকে অন্যতম কারণ বলেও মত দিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে দেশের অর্থনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যত্ চিত্র তুলে ধরার লক্ষ্যে ঐ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ডিসিসিআই। সংগঠনের সভাপতি ওসামা তাসীর অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
লিখিত বক্তব্যে ওসামা তাসীর বলেন, সরকারি খাতের বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও গত ছয় বছর ধরে জিডিপিতে (মোট দেশজ উত্পাদন) একই অবস্থানে, অর্থাত্ ২২ থেকে ২৩ শতাংশে রয়ে গেছে। দেশে এখন বিদেশি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ (০.৮৬ শতাংশ)। অথচ ভারতে এই হার ১ দশমিক ৫১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ২ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ সময় ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, এক অঙ্কে নামিয়ে আনার বিষয়ে সরকার ঘোষণা দিলেও এখনো সুদের হার ১১ থেকে ১৫ শতাংশ। এর ফলে ব্যবসায়ের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার জন্য খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে কোনোভাবে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অন্যথায় তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। উচ্চ সুদের পেছনে খেলাপি ঋণ অন্যতম কারণ। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ এবং ‘অনিচ্ছাকৃত খেলাপি’কে চিহ্নিত করার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির চেয়ে ব্যবসাকে টেকসই করা দরকার। দিন দিন উত্পাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যবসায়ের পরিবেশ উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিমালা সংস্কার এবং কোম্পানির করের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হার নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।
এ সময় ডিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আমাদের দৈনন্দিন গ্যাসের চাহিদা হচ্ছে ৩ হাজার ৬৫০ ঘনফুট। যার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২ হাজার ৬৫০ ঘনফুট। এছাড়া আমাদের শিল্পখাতে যে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, তার প্রতি ঘনফুটের দাম হচ্ছে ২৮ দশমিক ১১ সেন্ট। এটি ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বেশি।
এ সময় মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান, কৃষি খাত, উত্পাদন খাত বিশেষত পোশাক, চামড়া, ওষুধ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার, বন্দর পরিস্থিতি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত নিয়েও ডিসিসিআইর পক্ষ থেকে মতামত তুলে ধরা হয়।
সাম্প্রতিক রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভোগ ব্যয়ে কিছুটা শ্লথগতিকেও দায়ী করা হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পোশাক খাতের জন্য তিন শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়। বিদ্যুত্ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে স্থিতিশীল ও অনুমানযোগ্য মূল্য নির্ধারণ নীতি প্রণয়নের জোর দেওয়া হয়।
এছাড়া পুঁজিবাজার টেকসই না হওয়ার পেছনে বন্ড মার্কেটের অনুপস্থিতি, ভালো প্রতিষ্ঠান এবং সুশাসনের অভাবকে দায়ী করা হয়। দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারে বন্ড মার্কেট স্থাপন, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ব্যবহার উত্সাহিত করার ওপর গুরত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডিসিসিআইর সিনিয়র সহসভাপতি ওয়াকার আহমেদ, সহসভাপতি ইমরান আহমেদসহ অন্যান্য পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
