কর্মব্যস্ত জীবনে নিত্যকার কাজের চাপ, সংসারের নানা ঝামেলা—সবকিছুর সঙ্গে সমানতালে চলতে গিয়ে প্রায়ই আমরা হাঁপিয়ে উঠি। অনেক সময় ভুলে যাই, শেষ কবে শুধু আড্ডা মারার জন্য বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। কিংবা কবে সব ঝামেলাকে তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দিয়ে মন খুলে হেসেছিলাম। নিজেকে ভালো রাখার জন্য প্রথম ও প্রধান ওষুধ হলো—মন-প্রাণ খুলে হাসা। যারা প্রাণ খুলে হাসতে পারেন, তাদের জীবনের অর্ধেক অসুখ সেরে যায়। সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য হাসি কতটা জরুরি, তা নিয়ে লিখেছেন লোপা চৌধুরী
কোনো এক বিশেষ দিনে কোনো কারণে অথবা এমনি আপনার মনটা খুবই খারাপ। সেই সময় আপনি টিভিতে হাসির সিনেমা, টম অ্যান্ড জেরি অথবা মিস্টার বিন চালিয়ে দিন, দেখবেন নিজের অজান্তেই হাসতে হাসতে কখন যে আপনার মন ভালো হয়ে গেছে বুঝতেই পারবেন না। প্রাণ খোলা হাসি এমনই একটি ওষুধ, যা মুহূর্তের মধ্যেই উবে যাবে আপনার দুঃখ, কষ্ট, মন খারাপ। হিউমার আপনাকে অনুপ্রাণিত করে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে, নতুনভাবে জীবন এবং আমাদের চারপাশের পরিস্থিতিকে দেখতে। আর নতুন উদ্যম জীবনের যেকোনো বিপদ, ভয় ও দুর্বল মুহূর্তের মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। আর মন ও মেজাজ ভালো রাখতে অবশ্যই আপনাকে যত্নশীল থাকতে হবে। হিউমার আসলে এক ধরনের ব্রেনের এক্সপেরিয়েন্স। আমাদের মস্তিষ্কে ‘হিউমার মাসল’-এর এমন এক নেটওয়ার্ক আছে, যা বিভিন্ন সময়ে আমাদের মস্তিষ্কে নানা রকমের সিগন্যাল পাঠায়। হাসি আমাদের মস্তিষ্কের ‘ফিল গুড’ কেমিক্যাল মেসেঞ্জার ডোপামাইন স্টিমুলেট করতে সাহায্য করে। আরও একটি মজার দিক হলো—হাসি আমাদের স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। জীবনের প্রতিটি বিষয়ে অকারণে সিরিয়াস হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সবসময় যদি আমরা সিরিয়াস হয়ে থাকি, তাহলে দেখবেন আমাদের জীবন থেকে আনন্দ, হাসি, মজা সবকিছু একদিন কোথাও হারিয়ে গেছে। দিনের যেকোনো সময় আমাদের মন খারাপ হতে পারে। সেই সময় ভালোলাগার মানুষটিকে হয়তো কাছে পাওয়া সম্ভব না। এ রকম পরিস্থিতিতে কী করবেন? খুব সহজ কিছু সমাধান রয়েছে এর জন্য। আপনার ঘরের ভিতর এমন জিনিস বা ছবি রাখুন, যা দেখে আপনার হাসি পায়। হয়তো আপনার পছন্দের মানুষের জীবনে নানা ধরনের পরিস্থিতি আসতেই পারে। সেই ক্ষেত্রে সেসব পরিস্থিতি নিয়ে অকারণে চিন্তা না করাই ভালো। কিছু পরিস্থিতি সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ পৃথিবীর সব সমস্যা আপনার নিজের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব না। শুধু শুধু চিন্তা মানেই স্ট্রেস লেভেল বেড়ে যাওয়া আর তার সঙ্গে দেখা দেবে নানা অসুখের লক্ষণ। এসব থেকে যতটা দূরে থাকা যায়, ততই ভালো। যতটা সম্ভব বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের দারুণ পজিটিভ বিষয় থাকে। যা কি-না আপনার যেকোনো রকমের কঠিন পরিস্থিতিতেও আপনার মুখে হাসি নিয়ে আসবে। শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করুন। বাইরে বেড়াতে যান। দেখবেন আপনার মাথার ভিতরে যে চিন্তা ছিল, তা কখন যে দূর হয়ে গিয়েছে বুঝতেই পারবেন না। একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অতিরিক্ত ক্যালোরি বার্ন করার জন্যও হাসি খুবই উপকারী। মুখের ব্যায়াম হিসেবেও হাসি খুবই উপকারী। হাসার সময় আমাদের মুখের ১৫টি ছোট ছোট মাসল কাজ করার ফলে রক্ত সঞ্চালন বেশি হয় এবং হাসির ফলে মুখের ত্বক আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হাসি আমাদের নানারকম ব্যথা সহ্য করার শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। ক্যান্সারেও পেইন ম্যানেজমেন্ট হিসেবে হাসি অব্যর্থ। মন খুলে যে হাসতে পারবে, তার অর্ধেক অসুখ সেরে যাবে। এখন তো ডিপ্রেশন, হার্টের অসুখের চিকিত্সাতেও ডাক্তাররা লাফটার থেরাপি সাজেস্ট করছেন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে বেশকিছু লাফিং ক্লাবও চালু হয়েছে। ভোরবেলা পার্কে অথবা লেকের পাড়ে গেলে দেখা যায়, বেশকিছু মানুষ একসঙ্গে নানা রকমভাবে হাসছেন। আসলে বিভিন্ন লাফিং ক্লাবের সদস্যরা এমনভাবেই হাসির অনুশীলন করেন এবং আস্তে আস্তে এই অনুশীলনই ফিরিয়ে আনে জীবনের হারিয়ে ফেলা ছন্দ। বলা হয়, হাসি স্বর্গীয়। হাস্যরসিক ব্যক্তি বন্ধুবাত্সল, পরিবার-পরিজনবেষ্টিত সুখী মানুষ। নিঃসঙ্গ ব্যক্তির চেয়ে বন্ধুবান্ধব বেষ্টিত ব্যক্তি ৩০ গুণ বেশি হাসেন। যারা হাসেন, তাদের সঙ্গে আশপাশের মানুষের সংযোগ অধিকতর ঘনিষ্ঠ। সর্বোপরি, হাসি স্বাস্থ্যকর। তাই সবাই প্রাণ খুলে হাসুন ও সুস্থ থাকুন। দেখবেন, জীবনের মানেটাই বদলে গেছে।
