>> মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
বাসায় দৈনিক পেপার রাখা হতো। পড়ার প্রতি তার খুব ঝোঁক। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে অন্যান্য পত্রিকা ও ক্রোড়পত্র সংগ্রহ করত। টুকটাক লেখালেখিও করত সে। ছোটদের জন্য একটা পত্রিকা বের করার বিষয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করল সে। কেউ কেউ বলল, এতটুকু ছেলে পত্রিকা বের করবে! ২০১০ সালে ছেলেটির সম্পাদনায় পত্রিকা বের হলো। নাম মাসিক ‘লাল সবুজ’। তখন সে বরিশাল জিলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আত্মপ্রত্যয়ী এই কিশোরের নাম তাহসীন উদ্দীন। ছাপাকৃত পত্রিকার সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। পত্রিকার অফিসও আছে। আছে একদল খুদে লেখক। খুদে লেখকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বড়ো লেখক-সাংবাদিকেরা প্রশিক্ষণ দেয় তাদের। পত্রিকাটিতে প্রায় ত্রিশ জন শিশু সাংবাদিক কাজ করছে। টিফিন থেকে বাঁচানো টাকা, কিছু মানুষের অনুদান—শুরুতে এগুলো থেকে পত্রিকা প্রকাশের অর্থ আসত।
পত্রিকা বের হওয়ার পরে খুদে লেখকেরা সমাজসেবার কথা ভাবল। এজন্য দরকার সংগঠন। লাল সবুজ সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করল তারা। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ঈদের জামা উপহার, শীতে শিশুদের শীতবস্ত্র, খাবার বিতরণ, পিঠা উত্সব আয়োজন, ফেব্রুয়ারি মাসে বরিশালের বিল বোর্ডগুলোয় বানান শুদ্ধ করার উদ্যোগ, স্কুল-কলেজভিত্তিক বির্তক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, বৃদ্ধাশ্রমের মানুষদের সাহায্য প্রদান ইত্যাদি সমাজকল্যাণমূলক কাজ করে যাচ্ছে লাল সবুজ সোসাইটি। জেলা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে তাহসীন উদ্দীন। ২০১৩ সালে সে পেয়েছে ইউনিসেফের মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড। প্রজেক্ট অপরাজিতা, লাল সবুজ সোসাইটির এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এ প্রজেক্টে মেয়েদের মার্শাল আর্ট শেখানো হয়। এখন পর্যন্ত ১৮টি স্কুলে গিয়ে শেখানো হয়েছে। সিফাতুর রহমান, লোকমান হোসেন নামে দুজন মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক আছেন তাদের সঙ্গে। বিনামূল্যেই যারা প্রশিক্ষণ দেন। এতে মেয়েদের আত্মরক্ষায় সুযোগ বাড়ে। মার্শাল আর্ট শেখানোর কার্যক্রম ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে সব মহলে। যদিও কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ শুরুতে বুঝতেই চাইছিল না—মেয়েদের মার্শাল আট শেখা মন্দ কোনো কাজ নয়। তাদের নানাভাবে বুঝাতে হয়েছে বলে জানায় তাহসীন উদ্দীন।
লাল সবুজ সোসাইটির একটি স্কুলও আছে। এর আছে প্রায় ত্রিশজন ছাত্রছাত্রী। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের এখানে লেখাপড়া শেখানো হয়। সংগঠনের সদস্যরা বিনামূল্যে এ কাজ করে থাকে। তাদের একটি কর্মসূচির নাম তর্কের পাঠ, যা স্কুল-কলেজভিত্তিক বির্তক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। তিন মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ জন্য বরিশাল মহিলা কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের একটি রুম দিয়েছে।
বঙ্গবন্ধুকে শিশু-কিশোরদের জানতে জানাতে হবে—এই বোধ থেকে লাল সবুজের স্বপ্নবাজ তরুণেরা আয়োজন করে বঙ্গবন্ধুকে চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার। মেয়েদের সাইকেল চালানো শেখানো লাল সবুজের অন্যতম সফল প্রোগ্রাম। বিভিন্ন সময় শিশু-কিশোরদের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে সেমিনারেরও আয়োজন করে সংগঠনটি। বরিশালের কিছু মহত্ হূদয়ের মানুষ ডোনেশন দেয় তাদের। তারা নিজেরাও চাঁদা দেয়। মাঝে মাঝে কিছু প্রোগ্রামে স্পন্সর জোগাড় করে সংগঠনটি। ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে তাহসীন বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের কার্যক্রম বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে যাই। তৃণমূলে গিয়ে কাজ করতে চাই।’
