নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেন এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা আপত্তিকর মন্তব্য করায় গতকাল মঙ্গলবার সংসদে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা। জাপার দুই নেতাও এসময় রাঙ্গার কড়া সমালোচনা করেন। মাগরিবের নামাজের পর অনির্ধারিত এই আলোচনায় প্রত্যেকেই অভিন্নকণ্ঠে বলেছেন, ‘ধৃষ্ঠতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের জন্য সংসদে দাঁড়িয়ে রাঙ্গাকে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাইতে হবে।’ আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ রাঙ্গার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাপার প্রতি দাবি জানান, কেউ এই ধরনের কটুক্তিতে জাপার কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন, কেউ সংসদে রাঙ্গার বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ পদ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
এই আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাপা চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদেরও সংসদে উপস্থিত ছিলেন। তবে রাঙ্গাকে গত দুইদিন সংসদে দেখা যায়নি। রাঙ্গার সমালোচনা করে বক্তব্যের সময় জিএম কাদেরকে উঠে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক-দেড় মিনিট কথা বলতে দেখা যায়, এসময় প্রধানমন্ত্রীর ডানদিকের আসনে বসা ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
মাগরিবের বিরতির পর অধিবেশন শুরু হলে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে তাহ্জীব আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’-এ নূর হোসেনকে মাদকাসক্ত বলেছেন রাঙ্গা। নূর হোসেন আসক্ত ছিলেন, তবে সেই আসক্তি মাদকের প্রতি নয়-ছিল দেশ ও গণতন্ত্রের প্রতি। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীকেও কটাক্ষ করেছেন অর্বাচিন রাঙ্গা। নূর হোসেনকে নিয়ে অপমানজনক বক্তব্যের জন্য সংসদে দাঁড়িয়ে রাঙ্গাকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
পরে আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। রাঙ্গা সেই চেষ্টা করেছেন। নূর হোসেন যখন হত্যা হয়, তখন দেশে ফেনসিডিল-ইয়াবা ছিল না। ভোট ডাকাতি, মিডিয়া ক্যুর কথা বলা হয়। এই ভোট ডাকাতি ও মিডিয়া ক্যুর মূল হোতা ছিলেন এরশাদ। আজ সেটাকে ঢাকার জন্য রাঙ্গা এতবড় দুঃসাহস দেখাতে পারে না। এরশাদের সময় রাজনৈতিক নেতাদেরকে নির্যাতন ও পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। এরশাদকে শুধু আওয়ামী লীগ স্বৈরাচার বলে না, সারাদেশের মানুষ তাকে স্বৈরাচার বলে অভিহিত করেছে। বিশ্বে স্বৈরাচার বলে পরিচিতি পেয়েছে। রাঙ্গাকে অবশ্যই ক্ষমা চাইতে হবে।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, নূর হোসেনকে হত্যার ঘটনার পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বেগবান হয় এবং মানুষ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আমি অবাক হলাম- রাঙ্গা বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নূর হোসেনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অথচ রাঙ্গা ভুলে গেছেন এরশাদও নূর হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তার মা-বাবার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, সংসদেও ক্ষমা চেয়েছিলেন। রাঙ্গা তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে। তিনি আরও বলেন, এরশাদের মৃত্যুর পর তার মার্জিত আচরণের জন্য আমরা এই সংসদে প্রশংসা করেছিলাম। কিন্তু রাঙ্গার বক্তব্যের কারণে আজ সারাদেশে স্বৈরাচার শব্দটি উচ্চারিত হচ্ছে। রাঙ্গা যে বক্তব্য দিয়েছেন, এরজন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি যে এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেখানে আওয়ামী লীগ তার সঙ্গে না থাকলে নির্বাচিত হতে পারতেন কিনা সেটা আমরা বলতে চাই না। রাঙ্গা খুবই খারাপ বক্তব্য দিয়েছেন। আমি তার বক্তব্যে ঘৃণা প্রকাশ করি।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন- রাঙ্গা যেকথা বলেছেন এটা কোনো সুস্থ মানুষ বলতে পারে না। বঙ্গবন্ধু সর্ম্পকে কথা বলার আগে তার চিন্তা করা দরকার ছিল। রাঙ্গার এই বক্তব্য গণতন্ত্রের ওপর আঘাত। তাকে শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না, জাপাকে তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যাও দিতে হবে।
জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, আমাদের পার্টির চেয়ারম্যান (জিএম কাদের) এখানে আছেন। বিরোধীদলীয় নেতার (রওশন এরশাদ) সঙ্গেও গতরাতে আমার কথা হয়েছে। মসিউর রহমান রাঙ্গা যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি জাপা গ্রহণ করে না। এটা একান্তই তার ব্যক্তিগত। ওই বক্তব্য তিনি কেন দিয়েছেন, এই সংসদের সদস্য হিসেবে তিনিই সংসদে ব্যাখ্যা দেবেন। এই আলোচনায় জাপার কাজী ফিরোজ রশীদ, গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইভান্ডারিও অংশ নেন।
প্রসঙ্গত, প্রতিবছর ১০ নভেম্বর ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’ হিসেবে পালন করা হলেও জাপা দিনটিকে পালন করে ‘গণতন্ত্র দিবস’ হিসেবে। প্রতিবছরের মতো এবারও দিনটি উপলক্ষে রবিবার রাজধানীর বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয় মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় রাঙ্গা বলেন, ‘এরশাদ কাকে হত্যা করলেন। নূর হোসেনকে? নূর হোসেন কে? একটা অ্যাডিকটেড ছেলে। একটা ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর।’ রাঙ্গা তার বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী নিয়েও কটুক্তি করেন।
নূর হোসেনের মায়ের
কাছে রাঙ্গার দুঃখ প্রকাশ
এদিকে শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে কটুক্তির জন্য তার মায়ের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন মসিউর রহমান রাঙ্গা। গতকাল জাপার বনানী কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে রাঙ্গা বলেন, ‘নূর হোসেনকে নিয়ে অসতর্কভাবে আমার দেওয়া বক্তব্যে যে আঘাত পেয়েছেন, তার জন্য আমি তার মায়ের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। একইসঙ্গে যে বক্তব্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, সেসব বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। আমি আশা করি, এই বিষয়ে আর কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকবে না।’ অন্যদিকে নূর হোসেনকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় গতকাল রংপুর নগরীতে স্থানীয় যুবলীগ রাঙ্গার কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে।
