মানসিক স্বাস্থ্য লইয়া অজ্ঞতা দূর করিতে হইবে

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৪৮

আমরা যত বেশি আধুনিক জীবনের সহিত জড়াইয়া পড়িতেছি, আমাদের ভিতরে তত বেশি চাপিয়া বসিতেছে মানসিক টানাপোড়েন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘স্বাস্থ্য’-এর সংজ্ঞায় বলিয়াছে, কেবল নীরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নহে; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকিবার নামই স্বাস্থ্য। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক ১৭ শতাংশ মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত। এবং অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণভাবে এইসকল ব্যক্তি ৯২ শতাংশই কোনো চিকিত্সা গ্রহণ করেন না। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯-এ এই চিত্রই প্রকাশ পাইয়াছে। ইহার পূর্বে ২০০৩ হইতে ২০০৫ সালে একটি জরিপ হইয়াছিল। দেখা গিয়াছে, বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তের সংখ্যা তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায় বৃদ্ধি পাইয়াছে।

এই বার্তা আমাদের জন্য বিশেষ সংকেত বহন করে। কারণ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আগামী দিনের পৃথিবী হইবে মানসিক স্বাস্থ্যের পৃথিবী। সেই পৃথিবীর জন্য উপযুক্ত জনগোষ্ঠী তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নূতন জরিপে দেখা গিয়াছে, সাত হইতে ১৭ বত্সর বয়সি ১৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রহিয়াছে এবং ইহাদের ৯৫ শতাংশই কোনো ধরনের চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করে না। অর্থাত্ নূতন প্রজন্মের বড়ো একটি অংশ মানসিক সমস্যার অন্ধকারে ডুবিয়াই বড়ো হইতেছে। ভবিষ্যতে উন্নত জাতি হিসাবে নিজেদের প্রকাশ করিতে হইলে ইহাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব দিতেই হইবে। মনে রাখিতে হইবে, যখন একজন মানুষের চিন্তা, আবেগ আর আচরণ সুষম এবং স্বাভাবিক থাকে, তখন ধরিয়া নেওয়া যায়—তিনি মানসিকভাবে স্বাস্থ্যবান। মানসিক স্বাস্থ্য মানেই মানসিক রোগ নহে, বরং মনের যত্ন নেওয়া, নিজের সক্ষমতা আর দুর্বলতা বুঝিতে পারিবার বিষয় এবং দৈনন্দিন চাপের সহিত খাপ খাইয়া চলিবার বিষয়টিও মানসিক স্বাস্থ্যের সহিত নিবিড়ভাবে জড়িত। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও একটি প্রতিষ্ঠানকে যথাযথভাবে পরিচালিত ও উত্পাদনশীল হইবার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে যাহারা আসীন থাকেন, আধুনিক বিশ্বে ঐ সকল কর্তাব্যক্তি মানসিক স্বাস্থ্যসক্ষমতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া আসিতে হয়। তাহা ছাড়া, মানসিক টানাপোড়েন আর স্ট্রেসের কারণে উত্পাদনশীলতা কমিয়া যায় বলিয়া গবেষণায় বহু আগেই প্রমাণিত হইয়াছে। সুতরাং কর্মক্ষেত্রে সাধারণ কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও বিশেষ মনোযোগ দেওয়াটা এখন যুগের দাবি।

আশার কথা হইল, দেশে জাতীয় পর্যায় হইতে এখন মানসিক স্বাস্থ্যকে অতীতের তুলনায় অধিক গুরুত্ব দেওয়া হইতেছে। ইতোমধ্যে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতি ২০১৯ চূড়ান্ত করা হইয়াছে। স্নায়ুবিকাশজনিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করিতে স্নায়ুবিকাশজনিত প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট অ্যাক্ট ২০১৩ প্রণয়ন করা হইয়াছে। যদিও এখন অবধি আমাদের দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক মাত্র ২৬০ জন, সাইকোলজিস্টের সংখ্যা ছয় শতকের কাছাকাছি। দেশে সরকারি পর্যায়ে মানসিক রোগের জন্য অন্তর্বিভাগে মোট শয্যার সংখ্যা ৮৫০-এর কাছাকাছি। ১৬ কোটি মানুষের ভিতরে মানসিক সমস্যায় জর্জরিত বিপুলসংখ্যক মানুষের কথা চিন্তা করিলে ইহা যথেষ্ট অপ্রতুল। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকৃত বাজেটের অত্যন্ত সামান্য অংশ বরাদ্দ দেওয়া হইয়া থাকে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে। মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখিতে এই সকল সমস্যার মূলে যাইতে হইবে।