সঞ্জীব চৌধুরী :যার কবিতাই গান, গানেই বিপ্লব

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:৩২

আমি তোমাকেই বলে দেব/কী যে একা দীর্ঘ রাত/আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে/আমি তোমাকেই বলে দেব/সেই ভুলে ভরা গল্প/কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরোজায়/ ছুঁয়ে কান্নার রঙ ছুঁয়ে জোছনার ছায়া! —সঞ্জীব চৌধুরী

(জন্ম : ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৫—মৃত্যু : ১৯ নভেম্বর, ২০০৭)

হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে যে টগবগে তরুণ রাজপথে গণমানুষের কথা বলেছে সে আর কেউ নয়, আমাদের সঞ্জীব চৌধুরী। কবি, সাংবাদিক, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, নাট্যকার এবং সংগঠক হিসেবে খ্যাতি ছিল মেধাবী সব্যসাচী মানুষ সঞ্জীব চৌধুরীর। গানে গানে তিনি যেভাবে প্রতিবাদের ভাষা রপ্ত করেছিলেন তা বাংলা সংগীতে বিরল! শাসকদের চোখ রাঙানিতে যখন কম্পিত গোটা বাংলা, প্রত্যেক সাধারণ মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ যেখানে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করা হচ্ছে, সেখানে তিনি ঠিকই শোষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ তোলেন তার গানের মধ্য দিয়ে। এবং তিনি গানে গানে বলে গেছেন মানব জীবনের গাথা, প্রেম, বিরহ, সমাজ, রাজনীতি, প্রতিবাদ, দ্রোহ সমানভাবে তার গানে লেপ্টে আছে। নব্বই দশকে গণতন্ত্র যখন জাদুঘরে আর মানুষের অধিকার যখন শাসকগোষ্ঠীর তালুবন্দি, গান আর কবিতাপাগল সঞ্জীব চৌধুরী রাজচক্ষুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দলবল নিয়ে আন্দোলনে সরব ছিলেন। মানুষের কথা বলার অধিকার সবাই রাখে, কিন্তু সবার হিম্মত হয় না জেগে ওঠার। অনেকটা একরোখা মনোভাবের সঞ্জীব চৌধুরী পৃথিবীর স্বপ্নবিলাসী মানুষের কথাই বলেছেন গানে গানে। তিনি নিয়মতান্ত্রিক প্রথাগত সৃষ্টিতে কখনো বিশ্বাসী ছিলেন না। গান এবং কবিতাকে উচ্চমাত্রার আধুনিকতার ছোঁয়ায় পৌঁছে দিয়েছেন ভক্ত হূদয়ে। মেধাবী কিশোর সঞ্জীব পারিবারিক আড্ডা বেশ জমিয়ে তুলতেন নিজের বানানো ভূতের গল্প শুনিয়ে। কোনো কিছুই তার কাছে কঠিন হয়ে ওঠেনি। স্বাভাবিক সাদামাটাভাবেই কাটিয়ে দিলেন ছোট্ট জীবনটা। ঝলমলে আকাশের একটি তারা হঠাত্ই আলোকরশ্মি থেকে দূরে চলে গেল। চারদিকে কেমন জানি অন্ধকার! এভাবেই পৃথিবীর আলো-বাতাস ছেড়ে অকালে চলে গেলেন আমাদের সঞ্জীব চৌধুরী। বিশাল শূন্যতার মাঝে আজো অনেক চিত্কার, চেঁচামেচি শুনি, তবুও নীল আকাশের কান্না থামেনি।

সঞ্জীব চৌধুরী ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার পৃথিবীর বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচং-এর জলবান লক্ষ্মী বাউলের পাশের মাকালকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের আদি নিবাস সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার দশঘর গ্রামে। সেখানকার জমিদার শরত্ রায় চৌধুরী ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরীর পিতামহ। তার মামার বাড়ি মাকালকান্দি গ্রামে জমি ক্রয় করে পিতা ননীগোপাল চৌধুরী এবং মাতা প্রভাষিনী চৌধুরী বসতি স্থাপন করেন। নয় ভাইবোনের মধ্যে এ তাঁর অবস্থান সপ্তম। শরীরে জমিদার বংশের রক্ত থাকার পরও সঞ্জীব চৌধুরী পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। প্রতিটি লড়াই সংগ্রামে তার সক্রিয় অবস্থান ছিল। সঞ্জীব চৌধুরী হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন, পরিবারের সবাই ঢাকায় চলে যাওয়ায় তিনি বকসি বাজার নবকুমার ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে ১৯৭৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্ট্যান্ড মার্ক পেয়ে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে মেধা তালিকায় ১২তম স্থান অর্জন করেন। তার এই রেজাল্টে খুশি হয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ একদিন স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেন এবং ১৯৮০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তিনি মেধা তালিকায় স্থান করে নেন। বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, এমনকি বড়ো বোন ড. নীলিমা চৌধুরীর মাধ্যমে ব্যাঙ্গালোরে স্কলারশিপে ভর্তির সুযোগ পেয়েও ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে। পরে বিষয় পাল্টে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। সঞ্জীব চৌধুরীর কর্মজীবন শুরু হয় সাংবাদিকতা পেশার মাধ্যমে। কাজ করেছেন আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ ও যায়যায়দিনসহ বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায়। ফিচার সাংবাদিকতায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল তার সৃষ্টিশীলতা। বিশেষ করে দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত ফিচার বিভাগ শুরু হয় তার হাত ধরেই। বাংলাদেশে ফিচার সাংবাদিকতার জনক বলা চলে তাকে।

সঞ্জীব চৌধুরীর মধ্যে কাব্যপ্রতিভাও ফুটে ওঠে অসাধারণভাবে। নিজেও কবিতা লিখতেন আবার আবৃত্তিতেও বেশ স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। শুধু কবিতাই নয়, বেশ কিছু ছোটগল্পও লিখেছিলেন তিনি। তার লেখা গল্পগ্রন্থ ‘রাশপ্রিন্ট’ আশির দশকে বাংলা একাডেমি কর্তৃক সেরা গল্পগ্রন্থ হিসেবে নির্বাচিত হয়। আহমদ ছফাও সঞ্জীব চৌধুরীর লেখনীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। এমনিতে নাটকের স্ক্রিপ্টও লিখতেন সঞ্জীব চৌধুরী। নীল ক্লিনিক, রাশপ্রিন্ট, কোলাজ নামের তিনটি কবিতা, ছোটগল্প ও নাটকের পাণ্ডুলিপিকে একত্রিত করে বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী শিমুল মুস্তাফা ১৯৯০ সালে ‘রাশপ্রিন্ট’ নামে সঞ্জীব চৌধুরীর একমাত্র গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশ করেন। সঞ্জীব চৌধুরীর ছোট বোন বাবলী চৌধুরী জানান, বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘দলছুট’-এর  প্রতিষ্ঠাতা সঞ্জীব চৌধুরীর সংগীতজগতে কোনো ওস্তাদ নেই। নিজে নিজেই শিখেছেন গান, তবে তার মা প্রভাষিনী চৌধুরী ভালো ধামাইল গান ও ধর্মীয় গান জানতেন। মায়ের কণ্ঠে শোনা গানই সঞ্জীব চৌধুরীর প্রেরণা। সঞ্জীব চৌধুরীর কথা বলতে গেলেই চলে আসে আরেকটি নাম—বাপ্পা মজুমদার। ১৯৯৫ সালে ছন্নছাড়া তরুণ বাপ্পা মজুমদারকে সঙ্গে নিয়ে সঞ্জীব চৌধুরী ‘দলছুট’ ব্যান্ডের জন্ম দেন। ১৯৯৭ সালে দলছুটের প্রথম অ্যালবাম ‘আহ’ প্রকাশিত হওয়ার পরেই চারদিকে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। এরপর ‘হূদয়পুর’, ‘স্বপ্নবাজি’, ‘আকাশচুরি’, ‘জোছনা বিহার’, ‘টুকরো কথা’, ‘আয় আমন্ত্রণ’ নামে আরো কয়েকটি অ্যালবাম বেরিয়েছে এই ব্যান্ড থেকে। এর মধ্যে ‘স্বপ্নবাজি’ ছিল সঞ্জীব চৌধুরীর একক অ্যালবাম।

হাওর-বাওড় সবুজ প্রকৃতির বুকে বেড়ে ওঠা সঞ্জীব চৌধুরী নব্বই দশকের উত্তপ্ত রাজনৈতিক বাংলাদেশে উত্তাপ ছড়িয়েছেন নিজের খেয়াল-খুশিমতো। বাম ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সঞ্জীব চৌধুরীর ভেতরে কখনো ভয় বাসা বাঁধেনি। এই পচা-গলা পোশাকি সিস্টেম এবং শ্রেণিবৈষম্যের সমাজের বিপরীতে সঞ্জীব চৌধুরী দাঁড়িয়েছিলেন একরোখা তেজি বিপ্লবীর মতো, স্বপ্ন দেখেছিলেন সাম্যবাদী সমাজের, পা বাড়িয়েছিলেন আলোকিত পথে, বেঁচে থাকার কথা বলার জন্য রাজপথে ছিলেন সরব। কখনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, আবার কখনো তাদের চামচাদের মুখোশ উন্মোচনে সোচ্চার ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। অবরুদ্ধ সময়েও তার গান থামেনি। চারদিকে যখন বেয়নেট আর জলপাই রংয়ের ওড়াওড়ি, তখনো তিনি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেছেন স্বপ্নের কথা, আর্তনাদের কথা, শান্তির কথা। পৃথিবীর পথে পথে শান্তিকামী সঞ্জীব চৌধুরীর স্বপ্ন পিচঢালা পথে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত। বিশ্ব মোড়লরা চিবিয়ে খাচ্ছে একে অন্যের হাড়। তবুও স্বপ্নরা পাখির দলে, উড়ছে আকাশে বাতাসে। প্যারোডি গানের মধ্য দিয়েও তিনি মানুষকে প্রেরণা জুগিয়েছেন অনেক শক্তিশালীভাবে। কবিতা এবং গানে প্রতিনিয়তই বলে গেছেন গণমানুষের কথা। শ্রম ঘাম বিক্রি করে খেটেখাওয়া মানুষের কথা সঞ্জীব বলেছেন অনেক বেশি। সঞ্জীব চৌধুরীর দেখানো পথে কিছু মানুষ এখনো প্রতিবাদী আন্দোলনে থাকলেও সংখ্যায় অনেক কম। স্বপ্নের কাছে কথা রেখে বলতে পারি অথবা একদিন অসংখ্য সঞ্জীব; বুর্জোয়া জনপ্রতিনিধির গলা টিপে ধরবে। মুক্ত আকাশে, মুক্তমনে ঘুরে বেড়াবে খেটে খাওয়া মানুষের হূদয়ে।

চাপ চাপ কষ্ট, ফালি ফালি বেদনা গানের ভেতর, দীর্ঘ রাতের বুকের প্রান্তে আমাদের ফেলে দিয়ে সঞ্জীব চৌধুরী হেঁটে যান বিরান পথে, কবির হাজার বছরের পথে! তিনি গানের মধ্যে বলে যান সম্পর্কের অভিজ্ঞানের ভুল ইতিহাসে, কান্নার রং আর জোছনার ছায়ার ভেতর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যায়! ‘চোখটা এতো পোড়ায় কেন/ও পোড়া চোখ সমুদ্রে যাও/সমুদ্র কি তোমার ছেলে/আদর দিয়ে চোখে মাখাও?’ শুধু কি বিরহ? প্রেমের আকুল আবেদনও ফুটে উঠেছে তার গানে। প্রেমিকার প্রতি এক পাগল প্রেমিকের আবেদন প্রকাশ করতেই গানে গানে উজ্জীবিত সঞ্জীব চৌধুরী। ‘গাড়ি চলে না চলে না/ চলে না রে, গাড়ি চলে না/চড়িয়া মানব গাড়ি/যাইতেছিলাম বন্ধুর বাড়ি/মধ্য পথে ঠেকলো গাড়ি/উপায়-বুদ্ধি মেলে না।’ বাউল শাহ আব্দুল করিমের লেখা এ গানের কথাগুলোর মতো সত্যিই থেমে গেছে সঞ্জীব চৌধুরীর জীবনগাড়ি। সে কণ্ঠ দিয়ে তার আর কোনো নতুন গান জন্ম নেয় না। ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর বাইলেটারেল সেরিব্রাল স্কিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

সঞ্জীব চৌধুরীর উল্লেখযোগ্য কিছু জনপ্রিয় গান—‘আমি তোমাকেই বলে দেব’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘চল বুবাইজান’, ‘আকাশচুরি’, ‘হূদয়পুর’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘সমুদ্র সন্তান’, ‘তোমার ভাঁজ খোলো’, ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’, ‘স্বপ্নবাজি’, ‘আমি ফিরে পেতে চাই’ প্রভৃতি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের রাতজাগা তরুণেরা তার গান গেয়ে হলে ফেরে, ঘরে ফেরে কিংবা তারা আর ঘরে ফেরেই না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সবুজ ঘাস গালিচায় এখন আর রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, সঞ্জীব চৌধুরী, শিমুল মুস্তাফা, কামরুজ্জামান কামু-সহ একদল গান ও কবিতাপাগলদের প্রাণবন্ত আড্ডা নেই। সঞ্জীব চৌধুরীর গিটারের সুরে রুদ্র আর শিমুল কবিতা আবৃত্তি করেন না। কামু মনের সুখে কাগজ ছিঁড়ে ছিঁড়ে নতুন কবিতার গন্ধ পাচ্ছেন না। তবে হ্যাঁ, টিএসসির ‘সঞ্জীব চত্বরে’ সঞ্জীব উত্সব উদ্?যাপন করে প্রতি বছর সঞ্জীবভক্তরা। তিনি তার ভক্তদের হূদয়ে পরম শ্রদ্ধায় চিরকাল স্মরণীয় হয়ে বেঁচে থাকবেন।