বাংলাদেশের মেলা-পার্বণ

আবিমানি ওয়ানগালা

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:৩৪

সাধারণত খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী গারোদের জন্য খ্র্রিস্টান মিশনারিজ এরকম বড়ো আয়োজন করে থাকে। মিশনারিজগুলো বিভিন্ন এলাকার গারোদের একত্রিত করে আদি সাংসারেক গারোদের আদলে দিনব্যাপী বিনোদনের আয়োজন করে থাকে। এই আয়োজনকেই আবিমানি ওয়ানগালা নাম দিয়েছেন তারা। আবিমা মানে মা, মাটি, পবিত্র ভূমি। আর গারোরা ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণপাড়ের গারোদের আবিমানি বলে থাকেন। এই ওয়ানগালায় শুধু ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণপাড়ের গারোরা অংশগ্রহণ করছেন, তাই এর নাম দেওয়া হয়েছে আবিমানি ওয়ানগালা। এই আয়োজনে বিভিন্ন এলাকার প্রায় ১০০ দামা বাদককে একত্রিত করা হয়ে থাকে। যার কারণে এই আয়োজনকে ১০০ দামা ওয়ানগালাও বলা হয়ে থাকে। মধুপুরের জলছত্রের কর্পোস খ্রিস্টি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আজ এমনই এক আয়োজন। খুব ভোরে পৌঁছে গেছি আমি আর জাহিদ ভাই। স্কুল মাঠের মাঝখানে তৈরি হয়েছে রাক্কাসি দেবতার প্রতিমূর্তি। বাঁশের তৈরি রাক্কাসি, তার পাশে রাখা আছে ঝুড়ি। ঝুড়িতে নতুন ফসল, চুকুর ফল, গাছ আলু, ডিম, ধান। খেজুরের পাতা দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে একটি জায়গা, যেখানটাতে রাক্কাসির ঘর বানানো হয়েছে। তার পাশেই মাচান করা ঘর, যা গারো জাতির পূর্বপুরুষ আ না আফিলফার পাহাড়ি ঘর হিসেবে নির্দেশ করছে। ঘরে টাঙানো আছে দামার বড়ো এবং ছোট সংস্করণ। সুঠাম দেহী একজন গারো পুরুষকে সাজানো হয়েছে গারোদের আদি পূর্বপুরুষ হিসেবে। আর প্রবীণ কয়েকজন আচ্চুকে রাখা হয়েছে অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে নির্দেশনার জন্য। ১০০টি দামা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি গ্রামের দলকে বলা হয়েছে দামা নিয়ে হাজির হতে। এখানে ইতোমধ্যে হাজির হয়েছে জয়নাগাছার কমলা দিদির দল, গায়রা, পীরগাছা, জলছত্র, মুক্তাগাছা, চুনিয়া, দোখলার দামার দল। এছাড়া শিঙ্গা আর সানাই নিয়ে আছেন কিছু প্রবীণ বাদক। প্রতিটা দলের মেয়েদের পোশাকের রং ভিন্ন। রং দেখেই ঠাহর করা যায় যে তারা আলাদা আলাদা এলাকার প্রতিনিধিত্ব করছেন। পরনে ওপরের অংশে ব্লাউজ এবং তার ওপরে ওড়নাজাতীয় একচিলতে কাপড়। কোমর থেকে নিচের অংশে পেঁচিয়ে পরা প্রশস্ত একটি কাপড়। গলায় পুঁতির মালা, কোমরে সিলভারের বিছা। মাথায় কাপড় বাঁধা, কাপড়ের পেছনের অংশে মুরগির পালাক লাগানো। কপালে গালে থক্কা। আর পুরুষদের কোমরের নিচে ধুতি, ওপরের অংশে টিশার্ট আর মাথায় সাদা কাপড়ের বাঁধন তার পেছনের দিকে মুরগির পালক গেঁথে দেওয়া।

চালের গুঁড়া পানিতে মিশিয়ে রং বানানো হয়েছে। পাতার শিরা দিয়ে বানানো হয়েছে ছাপদানি। চালের গুঁড়ার পানিতে ছাপদানি ভিজিয়ে কপালে ও গালে ছাপ দেওয়া হচ্ছে। মাঠের প্রবেশমুখে চলছে এই ছাপ দেওয়ার কাজ। একে বলা হয় থক্কা। থক্কা দিয়ে সকল মেহমানকে স্বাগত জানানো হচ্ছে অনুষ্ঠানে। মাঠের বাইরে পতিত খালি জায়গায় বসেছে মেলা। নানা জেলার ব্যবসায়ীরা পসরা নিয়ে অংশগ্রহণ করছেন মেলায়। তবে পাহাড়ি অনুষ্ঠানের স্বকীয়তা জানান দিতে মেলায় বিক্রি হচ্ছে কুচিয়া, নাপ্পি, শূকরের মাংস; আছে বিচ্চি। দুপুরের খাবারের বিরতি দেওয়া হলো। কেন্দ্রীয়ভাবে সকল অংশগ্রহণকারীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আয়োজকদের একজন ইউজিনদা আমাদের খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। জাহিদ ভাই খেয়ে নিলেন। তবে পেটের নানাবিদ সমস্যার কারণে আমি নিয়মিতই অনেক খাবারের স্বাদ নিতে ব্যর্থ হই। আজও তা-ই হলো।

দিবসের দ্বিপ্রহরে অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত অতিথিরা এসে হাজির হলেন। অনুষ্ঠানের সূচনা ঘোষিত হতেই চারদিক থেকে নিমেষেই বেজে উঠল শত দামা, সঙ্গে কারা, শানাই আর শিঙ্গা। বাদ্যে চারদিক গমগম করছে। মার্চপাস্টের আদলে সবগুলো দল মাঠ প্রদক্ষিণ করছে। এভাবে সবগুলো দলের মার্চপাস্ট শেষ হলে একেকটা দলের পরিবেশনা শুরু হলো। কেউ জুমনৃত্য, কেউ ফসলকাটা নৃত্য, কেউ বিয়ের নৃত্য, কেউ বা আবার রাক্কাসি তুষ্টি নৃত্য করছে। প্রায় তিন ঘণ্টার মতো মন্ত্রমুগ্ধের মতো পরিবেশনা চলল। একসময় পরিবেশনা শেষ হলো, ততক্ষণে সন্ধ্যা নামে নামে। এর মধ্যে পঁচিশমাইলের সর্বকর্মের কর্মা অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর জওয়ান সিলভেস্টার দার সঙ্গে পরিচয় হলো। জাহিদ ভাই তার বাড়িতে থাকতে চাইলেও আমার সোজা সিদ্ধান্ত স্কুলের এরিয়াতেই থাকতে হবে। আমি জেনেছি বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত দলগুলো স্কুলেই রাত্রিযাপন করবেন। আয়োজনের স্বকীয়তা অনুধাবন করতে হলে এখানেই তাদের সঙ্গে থাকতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ, তাদের সঙ্গে থাকতে হবে। তাঁবু খাটিয়ে ফেললাম রাত্রিযাপনের জন্য জায়গা নেওয়া দলগুলোর মাঝখানে। বয়স্করা প্রথম দিকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। কয়েকজন তরুণকে এর মধ্যে ম্যানেজ করে ফেলেছি, ওরা আমার ভক্ত হয়ে গেছে, আর ভয় নেই। সারারাত আনন্দ আর বাদনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করল তারা, খুব মজা করেই রাত কাটালাম। তবে জাহিদ ভাই মহাবিরক্ত, কারণ তিনি ঘুমাতে পারলেন না। তবে আমি কিন্তু এই হৈ-হুল্লোড়ের মাঝেও শেষ রাতে খুব শান্তিতে ঘুমালাম।

শীতসকালের জলছত্র রোমান্টিক, লাস্যময়ী, ঘোরলাগা এক জনপদ। পঁচিশমাইল একটি অতি পরিচিত জনপদ। পঁচিশমাইলকে জলছত্র এলাকার প্রবেশপথ বলা যায়। জলছত্র আরো একটি কারণে খুব পরিচিত, এখানে সদর রাস্তার পাশঘেঁষে প্রতিদিন বসে আনারসের হাট। ভোরে চারদিক থেকে বাইসাইকেল, ভ্যান, রিকশা, ঠেলাতে করে আনারস আসতে থাকে। একসময় রাস্তার পার্শ্ববর্তী এলাকা ভরে যায় আনারস আর কলায়। আনারস এবং কলা ওঠে প্রচুর। ব্যবসায়ীরা এখান থেকে আনারস ও কলা কিনে বড়ো শহরে নিয়ে যায় বিক্রির জন্য। সকাল ১০টার মধ্যে বাজারের পাইকারি বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়। তবে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা আনারস নিয়ে বসে থাকেন—শহরগামী মানুষ প্রাইভেটকার থামিয়ে দু-এক হালি কিনে নিয়ে যাবেন এই প্রত্যাশায়। এক মধুর অভিজ্ঞতা নিয়ে আনারস কিনে ঢাকার বাসে চড়ে বসলাম। 

গারো জাতিকে মান্দিও বলা হয়। যার অর্থ মানুষ। গারোদের প্রধান দেবতা রাক্কাসি। গারোদের ধর্মের নাম সাংসারেক। ধর্মীয় গুরুকে খামাল বলা হয়। তারা বাঁশের তৈরি রাক্কাসির বন্দনা করে থাকেন। প্রকৃতিপুত্র সাংসারেক গারোদের মতে প্রকৃতি অপবিত্র ও প্রকৃতিতে নানা অপদেবতার বাস। কাজেই এই প্রকৃতি থেকে অপদেবতাদের বিতাড়িত করে প্রকৃতিকে পবিত্র করতে হয়। এটাও তাদের প্রকৃতি বন্দনার একটা কারণ। আর বছরে নতুন ফসল ঘরে তুলে খাওয়ার আগে বিধাতাকে তুষ্ট করার প্রচলন থেকেই মূলত ওয়ান্নার আয়োজন করা হয়ে থাকে। সাংসারেক নিয়মে যে ওয়ান্না করা হয় তা তিন দিনব্যাপী হয়ে থাকে। আর খ্রিস্টান মিশনারিজ কয়েকটা অঞ্চল নিয়ে যে আয়োজন করে, সেটা একদিনের। এখানে একটা বিষয় আলোচনা জরুরি। গারোরা সাংসারেক নিয়মে যে ওয়ান্না করে থাকে তা কিন্তু বিলুপ্তির পথে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাংসারেক খামাল বা পুরোহিতদের মধ্যে একমাত্র চুনিয়ার জনিক নকরেক বেঁচে আছেন। তার বয়স শত বছর ছাড়িয়েছে এক যুগ আগে। আমরা দেখি সাধারণত কোনো পেশার ধারকের পথ ধরে রাখেন তার সন্তান। তবে জনিক খামালের পথ তার ছেলে ধরে রাখেননি। তার ছেলে জনসন খামাল হলেও তিনি খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। বলা যায় জনিক নকরেকের দেহত্যাগের মধ্য দিয়ে এই প্রাচীন ধর্মাচারটির ইতি ঘটবে।

জলছত্রে অনেকটা স্বকীয়তা বজায় রেখে ওয়ানগালা উত্সব পালন করা হয়। আমরা শেরপুরের মরিয়মনগরে দেখেছি ওয়ানগালার নামে যে আয়োজন করা হয়, সেখানে বাঁশের তৈরি রাক্কাসির পরিবর্তে নৈবদ্য দেওয়া হয় ক্রুসের সামনে। আদি গারো সাংসারেক ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম সাংসারেক নিয়মের ওয়ানগালা কী তা ভুলে যাবে। কাজেই ওয়ানগালাকে ওয়ানগালার মতো করেই করার ওপর জোর দেওয়া উচিত। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী গারোরা যদি এই অনুষ্ঠান করতেই চান অন্য যে কোনো নামে করতে পারেন। এতে করে ওয়ানগালা নামের এই প্রাচীন ধর্মাচারটি সংরক্ষিত হবে, খ্রিস্টান গারোদের কাছে নতুন একটি পার্বণ আমরা পাব। সংস্কৃতিসচেতন সকলের কাছে সাংসারেক ওয়ান্নাকে বাঁচানোর আহ্বান জানিয়েছেন সাংসারেক গারোরা।