রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন লাইনচ্যুত, ইঞ্জিনসহ তিন বগিতে আগুন

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২২:১৭

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সিরাজগঞ্জে দুর্ঘটনায় পড়েছে রংপুর এক্সপ্রেস। এতে ট্রেনের ইঞ্জিন ও ৮টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। দুর্ঘটনায় ট্রেনের ইঞ্জিন, পাওয়ার কার, একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেয়ার বগি ও একটি শোভন চেয়ার বগিতে আগুন ধরে যায়। উল্লাপাড়া স্টেশনে পয়েন্টিং সিগন্যালের ত্রুটির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উদ্ধার কাজ চালান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। আগুন ধরার খবর পেয়ে উল্লাপাড়া ও শাহাজাদপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে ৬ টি ইউনিট এসে আধা ঘন্টার মধ্যে আগুন নিভিয়ে ফেলে। এ ঘটনায় ট্রেনের লোকোমাস্টার তারেক, সহকারী লোকোমাস্টার মোশারফসহ ৩০ যাত্রী আহত হয়েছেন।  তাদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনা তদন্তে  তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

যেভাবে দুর্ঘটনা :প্রত্যক্ষদর্শী, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে রংপুরগামী রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি দুপুর ২ টার দিকে উল্লাপাড়া রেল ষ্টেশনের সম্মুখ পয়েন্টে (ফেস পয়েন্ট) ঢোকার পথে লাইনচ্যুত হয়।  দুর্ঘটনায় ট্রেনের ইঞ্জিন মূল লাইন থেকে ১৫ ফুট দূরে ছিটকে পড়ে আগুন ধরে যায়। ওই আগুন ইঞ্জিনের সঙ্গে থাকা ১টি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বগিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত উদ্ধারকারীরা বগির জানালার গ্লাস ভেঙ্গে যাত্রীদের টেনে-হিঁচড়ে বের করেন। এছাড়া ট্রেনের পাওয়ার কার ও অন্য একটি বগিতে আগুন ধরে যায়।

মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী ওই ট্রেনের শীতাতপ চেয়ার বগির যাত্রী ছিলেন। তিনি বলেন, উল্লাপাড়া ষ্টেশনে ঢোকার মুখে ট্রেনের ইঞ্জিন কয়েকবার কেঁপে ওঠে। এর পরপরই তাদের বগিটি ২/৩ বার বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়ে লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে।  আগুন ধরে গেলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনগণ জানালার কাঁচ ভেঙ্গে তাকে টেনে হিঁচড়ে বের করেন।

এ ব্যাপারে উল্লাপাড়া রেল ষ্টেশনের মাষ্টার রফিকুল ইসলাম জানান, রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ২নং লাইনে যাওয়ার জন্য সিগন্যাল দেওয়া ছিল। কিন্তু ট্রেনটি ফেস পয়েন্টে এসেই ঝাঁকুনি দিয়ে উপরে উঠে ১নং লাইনে ঢুকে পরে এবং দুর্ঘটনা কবলিত হয়।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন এ ব্যাপারে জানিয়েছেন, রেললাইনের সিগ্যনালের সিম পয়েন্ট নামে যে অংশটি দিয়ে ট্রেনকে এক লাইন থেকে অন্য লাইনে যেতে সাহায্য করে, সেখানে কোনো ত্রুটি থাকতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা রিপোর্ট দিলে হয়তো পুরোপুরি বলা যাবে। তিনি জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত:এদিকে এই দুর্ঘটনার পর বৃহস্পতিবার দুপুর ২ টা  থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত রেলের পশ্চিমাঞ্চলের লালমনিরহাট ও পাকশী বিভাগের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। রাত সাড়ে ৮ টার দিকে উল্লাপাড়া রেলস্টেশনে ব্রডগেজ লাইন মেরামত করে শুধু ব্রডগেজের ট্রেন চলাচল শুরু হয়। তবে মিটারগেজ লাইনের ট্রেন চলাচল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। এ অবস্থায় হাজার হাজার রেলযাত্রী বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়েন। ঢাকাগামী চিত্রা এক্সপ্রেস ও দ্রুতযান এক্সপ্রেসের যাত্রীরা চাটমোহর ও ভাঙ্গুরা স্টেশনে আটকা পড়েন। পঞ্চগড়গামী পঞ্চগড় এক্সপ্রেস জামতৈল স্টেশনে আটকা পড়ে। এছাড়া বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামগামী লালমনি এক্সপ্রেস এবং কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের যাত্রা বাতিল করে দেয় রেল কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনার কারণে সুন্দরবন এক্সপ্রেস, ধূমকেতু এক্সপ্রেস, একতা, সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, বেনাপোল এক্সপ্রেস, পদ্মা এক্সপ্রেসহ ১০ টি ট্রেন চলাচলে অন্তত ৬/৭ ঘন্টা বিলম্ব হয়। 

তদন্তে কমিটি:খবর পেয়ে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন সিরাজগঞ্জের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক রায়হানা ইসলাম, উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামানসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। রেলের একটি সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনায় পশ্চিম রেলের পাকশী বিভাগীয় অফিসের ডিটিও আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আহবায়ক করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া রেলপথ মন্ত্রণালয় ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন আরো দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।