মহান বিজয় দিবস যেই বার্তা বহিয়া আনে

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৩৭

 ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়’। শতাধিক বর্ষ পূর্বে কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় এই কথা বলিয়া গিয়াছেন। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, আমরা স্বাধীনতা পাইয়াছি। পাইয়াছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আজ মহান বিজয় দিবস জাতির শ্রেষ্ঠ গৌরব, অহঙ্কার ও আনন্দ উজ্জ্বলতার একটি অনন্য অভূতপূর্ব দিন। অগণিত মানুষের সীমাহীন দুঃখ-দুর্ভোগ ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন এই বিজয় মুকুট ৪৭ বত্সর পূর্বে শিরোধার্য করিয়াছিল বাংলাদেশ। এই পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের পরে কেবল বাংলাদেশই ঘোষণা দিয়া মুক্তিযুদ্ধ শুরু করিয়াছিল এবং অর্জন করিয়াছিল মহান বিজয়। সুদীর্ঘ ২৩ বত্সর ধরিয়া পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নিপীড়ন আর সীমাহীন বঞ্চনার শৃঙ্খল ভাঙিয়া বাহির হইয়া আসিবার অমোঘ বাণী বজ নির্ঘোষ কণ্ঠে একাত্তরের সাতই মার্চ ঘোষণা করিয়াছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

বিজয় দিবস আমাদের জন্য যুগপত্ অনির্বচনীয় আনন্দ ও বেদনার বার্তা বহন করিয়া আনে। আনন্দ বিজয়ের—শত শত বত্সরের পরাধীনতার শৃঙ্খল হইতে মুক্তির আনন্দ। বাঙালির জীবনে এমন আনন্দের উপলক্ষ যে ইতিপূর্বে আর আসে নাই। কিন্তু দীর্ঘ নয় মাসের রুদ্ধশ্বাস অমানিশার অন্ধকার বিদীর্ণ করিয়া ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের যে-সূর্য উদিত হইয়াছিল তাহার পরতে পরতে জড়াইয়া ছিল অজস্র স্বজনহারা মানুষের অশ্রু-যন্ত্রণা-নির্যাতন-দুঃসহ দুঃখগাথা। পাকিস্তানিদের শোষণের নাগপাশ হইতে মুক্ত হইয়া আমরা গত ৪৭ বত্সরে কী অর্জন করিয়াছি—তাহা দেখা যাইতে পারে বিজয়ের দর্পণে। প্রথম কথা হইল, স্বাধীনতার চাইতে বড় অর্জন আর কী হইতে পারে! আমরা অর্জন করিয়াছি স্বাধীনতা, সার্বভৌম ভূখণ্ড। পাইয়াছি বাঙালি জাতির যাবতীয় স্বকীয়তা এবং একটি পাসপোর্ট। সমাজ ও অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হইয়া উঠিয়াছে স্বাধীনতার জাদুর কাঠির পরশ। বংশানুক্রমিক দারিদ্র্য কেবল পিছুই হটে নাই, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হইবার স্বপ্ন এখন আর সুদূরপরাহত নহে। বিশাল এক কর্মযজ্ঞ শুরু হইয়া গিয়াছে দেশব্যাপী। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রযাত্রাকে ‘বিস্ময়কর’ বলিয়াছে একাধিকবার।

বিজয় দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করিতেছি মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানিদের। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পাশে ছিলেন যাহারা—ভারতসহ সহযোগিতার হাত বাড়াইয়া দেওয়া সকল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সমাজের প্রতি রহিল হূদয়সিঞ্চিত ভালোবাসা। পৃথিবীর সকল জাতির বিজয় দিবস থাকে না। আমাদের আছে। পৃথিবীর অনেক দেশের ঔপনিবেশিক পরাধীনতার অবসান ঘটিয়াছে বিনা রক্তপাতে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হইয়াছে রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধে অগণিত মানুষের প্রাণের বিনিময়ে—এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। সুতরাং স্বাধীনতার পরবর্তীকালে চার যুগে আমাদের যেই অর্জন, তাহার নেপথ্যে রহিয়াছে ওই অতুলনীয় আত্মত্যাগ। আমরা যদি বাংলাদেশকে একটি কল্যাণকর উন্নত রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া তুলিতে পারি, তবেই না এই নিযুত নিযুত মানুষের আত্মত্যাগের প্রতি সত্যিকারের সম্মানজ্ঞাপন করা হইবে।