অণুগল্প

শর্ত ভঙ্গ

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:৫১

আট বছর আগে ফরহাদ বিয়ে করেছিল রেহানাকে। বিয়ের দ্বিতীয় বছরে রেহানা মারা যায় সন্তান প্রসবের সময়। একটি ছেলে হয়েছিল। ছেলেটি এখন লালিতপালিত হচ্ছে বড়ো ভাবির কাছে। বড়ো ভাবি নিঃসন্তান।

রেহানা খুব সুন্দরী ছিল না। কিন্তু বড়ো আকর্ষণীয়া ছিল। হাসবার সময় তার গালে টোল পড়ত। এই টোল ছিল ফরহাদের খুব প্রিয়। টোল দেখার জন্য সে নানান কথা বলে রেহানাকে হাসাত। রেহানা বুঝেও না-বোঝার ভান করত। রেহানার চোখ দুটো ছিল অদ্ভুত মায়াময়। সে যখন তার পটল চেরা চোখ দুটোর পাপড়ি মেলে ধরে তাকাত, তখন মনে হতো কোন সুদূরে তার দৃষ্টি হারিয়ে গেছে। কোনো এক অজানাকে জানার আকুতি থাকত তার সে দৃষ্টিতে।

আজ রেহানা নেই। তার স্মৃতিই ফরহাদের একমাত্র সম্বল। রেহানার আকষ্মিক মৃত্যুর পর ফরহাদ কয়েক দিন উদ্ভ্রান্তের মতো ছিল। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করত না।  কারো সাথে কথা বলত না। এমনকি ঠিকমতো অফিসেও যেত না। ছেলের কোনো খোঁজখবর নিত না। ভীষণ রাগ হতো ওকে দেখলে। তার মনে হতো, ছেলের জন্যই রেহানার মৃত্যু হয়েছে। ফরহাদ প্রতিজ্ঞা করেছিল জীবনে আর কখনো বিয়ে করবে না। মেয়েরা  বিশ্বাসঘাতক। না বলেই হারিয়ে যায়।

বাবা-মা আত্মীয়স্বজন অনেক চেষ্টা করেছেন ফরহাদকে আরেকটা বিয়ে করাতে। তারা বোঝালেন, জীবন একটাই। কারো জন্য জীবন থেমে থাকে না। জীবন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে অনাগত দিনের দিকে।

দিন যায়, মাস যায়, বছরও গড়িয়ে যায়। ধীরে ধীরে রেহানার স্মৃতিও ঝাপসা হতে থাকে ফরহাদের জীবনে। রাতে আকাশে যখন চাঁদ ওঠে, সমস্ত প্রকৃতি যখন স্তব্ধ হয়ে থাকে। নির্জন পুকুরঘাটে বসে থাকতে তার ভালো লাগে। অদ্ভুত সুন্দর পৃথিবী! মানুষ, পশু, পাখি, গাছ, নদীর কলতান তার ভালো লাগতে  শুরু করে। আবার নতুন করে বাঁচার সাধ জাগে। কাউকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে পেতে ইচ্ছে করে।

অবশেষে বাড়ির সকলের অনুরোধে ফরহাদ আবার বিয়ে করতে রাজি হয়। কিন্তু একটি শর্তে। কোনো বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা মেয়েকে সে বিয়ে করবে না। যে মেয়ের জীবনে কোনো পুরুষ আসেনি। অর্থাত্ যে মেয়ে অন্য কাউকে ভালোবাসেনি। যার কোনো ভালোবাসার স্মৃতি থাকবে না। ফরহাদই হবে তার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র পুরুষ।

সবাই লেগে গেল পাত্রীর সন্ধানে। কোনো ভদ্রঘরের কুমারী মেয়ে পাওয়া গেল না। কোনো মেয়েই বিপত্নীক পুরুষকে বিয়ে করতে রাজি হয় না। সব মেয়েই চায়, তার জীবনে যে পুরুষ আসবে সে হবে তার প্রথম ভালোবাসা, প্রথম প্রেম।  যার জীবনে অন্য কোনো মেয়ের স্মৃতি থাকবে না।

দু’একটি কুমারী মেয়ের প্রস্তাব আসে অপেক্ষাকৃত কম সামাজিক মর্যাদায় যাদের অবস্থান। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা রাজি হয় না। সমমর্যাদায় বিয়ে না হলে সংসারে শান্তি আসে না। বিয়ে শুধু দুই নর-নারীর মধ্যে হয় না—দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক হতে হয়।

অবশেষে একটি পাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেল। বর্তমানে তাদের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো না হলেও এককালে সচ্ছল ছিল। তখন তাদের গাড়ি ছিল।

নির্দিষ্ট দিনে ফরহাদ, মা-বাবা, ভাইয়া-ভাবি পাত্রী দেখতে এলো। মেয়ে অপূর্ব সুন্দরী। সকলের খুব পছন্দ হলো। ভাবির মতে, ডানা কাটা পরী। বিশেষ কোনো কথাবার্তা হলো না। ফরহাদের শর্তের কথা সবাই ভুলে গেল। এমনকি ফরহাদও। দেনমোহর, দেনা-পাওনা নিয়ে কোনো বিতর্ক হলো না। নির্দিষ্ট দিনে বিয়ে হয়ে গেল। পাত্রীর নাম জেসমিন।

বিয়ের কিছুদিন পর জানা গেল, জেসমিনের ইতিপূর্বে একবার বিয়ে হয়েছিল। সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী মারা যায়। জেসমিনের পাঁচ বছর বয়সী একটা মেয়ে আছে। থাকে তার বড়ো বোনের কাছে।

জেসমিনদের কোনো দোষ নেই। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়নি জেসমিনের পূর্বে বিয়ে হয়েছিল কি না। পাত্রী দেখে পাত্রপক্ষ কোনো কিছুই জানতে চায়নি। পাত্র যে বিপত্নীক তা পাত্রীপক্ষ আগেই জানত।

অলংকরণ :অভিজিত্ চৌধুরী