রামগড়-সাব্রুম স্থলবন্দর

ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন দ্বার খুলবে

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:৫২

ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতু-১ এর নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে চলছে। ভারত সরকারের অর্থায়নে নির্মাণাধীন এ সেতুটির নির্মাণকাজ ২০২০ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার              কথা। এটি নির্মাণ হওয়ার পরই বহু প্রতীক্ষিত রামগড়  সাব্রুম স্থলবন্দরের কার্যক্রম চালু হবে। বাংলাদেশের ১৫তম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম এ স্থলবন্দর চালু হলে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটনসহ সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।  এ কারণে রামগড়-সাব্রুম স্থলবন্দর চালুর প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে দুই দেশের মানুষ। অন্যদিকে, ভারত দক্ষিণ           এশিয়ার সঙ্গে সেভেন সিস্টারখ্যাত তাদের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সাতটি অনুন্নত রাজ্যের ‘গেটওয়ে’ হিসেবে দেখছে মৈত্রী সেতুটিকে।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরকালে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে রামগড়-সাব্রুম স্থলবন্দর চালুর যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফেনী নদীর ওপর নির্মাণাধীন বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১ নামে সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক উন্মোচন করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রামগড়-সাব্রুম স্থলবন্দর চালুর লক্ষ্যে সীমান্তবর্তী ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতু-১ নির্মাণ কাজের জন্য ২০১৭ সালের এপ্রিলে আগরওয়াল কনস্ট্রাকশন নামে গুজরাটের একটি প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার নিযুক্ত করে ভারতের ন্যাশনাল হাইওয়েস অ্যান্ড ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেড (এনএইচআইডিসিএল) সংস্থাটি। নির্মাণ কাজের নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ৪১২ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৪ দশমিক ৮ মিটার প্রস্থের দুই লেন বিশিষ্ট এক্সটা ডোজড, ক্যাবল স্টেইড আরসিসি মৈত্রী সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে ২০১৭ সালের নভেম্বরে।

সরেজমিনে সেতু নির্মাণকাজ পরিদর্শন করে দেখা গেছে, বাংলাদেশ-ভারত দুই অংশেই বিরামহীনভাবে সেতুর কাজ করছেন ভারতীয় প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা। নির্মাণ কাজে ব্যবহূত ভারী ভেহিক্যাল, মেশিনারিজ এবং নির্মাণসামগ্রী এপারে আনতে নদীর ওপর অস্থায়ী সেতু তৈরি করা হয়েছে। কর্তব্যরত ভারতীয় প্রকৌশলী মতিউর রহমান সেতুর নির্মাণ কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বলেন, ৬৫ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ আগামী বছরের জুনের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তিনি বলেন, ৪১২ মিটার দীর্ঘ এ সেতুর মোট পিলার রয়েছে ১২টি। এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে নির্মাণ করা হয়েছে আটটি ও ভারতের অংশে চারটি। স্প্যান রয়েছে ১১টি। বর্তমানে বাংলাদেশ অংশে ছয়টি, ভারতের অংশে দুটি এবং তিনটি মেইন স্টিল গার্ডার স্প্যানের কাজ চলছে। দৈনিক প্রায় ১৫০ জন শ্রমিক ও ১১ জন প্রকৌশলী সেতুর নির্মাণ কাজে নিয়োজিত আছেন। তিনি জানান, সেতু থেকে ২৪০ মিটার এপ্রোচ রোড নির্মাণ করে রামগড়-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের সঙ্গে এবং ওপারে সেতু থেকে প্রায় ১২০০ মিটার এপ্রোচ রাস্তা নবীনপাড়া-ঠাকুরপল্লী হয়ে সাব্রুম-আগরতলা জাতীয় সড়কে যুক্ত হবে। প্রায় ১০০ কোটি ভারতীয় রুপি ব্যয় করে সেতুটি নির্মাণ করছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

মৈত্রী সেতুর সাব্রুম অংশে নির্মাণকাজ পরিদর্শনকালে সংবাদমাধ্যমকে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব বলেন, ফেনী নদীর ওপর নির্মাণাধীন ফেনী ব্রিজ হবে ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশের বাণিজ্যিক সেতুবন্ধন। ত্রিপুরা পাবে ৭০ কিলোমিটারের মধ্যে চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দর। এ বন্দর ব্যবহার করে ত্রিপুরাতে অর্ধেক খরচে পৌঁছে যাবে প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী। ফেনী ব্রিজই দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের সেতুবন্ধন রচনা করবে। ত্রিপুরার বিরাট সমস্যার সমাধান হবে। এ ব্রিজ হয়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী, রড, সিমেন্ট, ইটসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সামগ্রী অল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে ত্রিপুরায় পৌঁছে যাবে। জলপথ ব্যবহারের সুযোগের কারণে পণ্য পরিবহন ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসবে। ভারতের অন্যান্য বাজার বা শহর থেকে ত্রিপুরায় উন্নয়ন সামগ্রীর দাম অনেক কমে পাওয়া যাবে। ব্যবসা-বাণিজ্য এখানে প্রসার ঘটলে বাংলাদেশেও লাভবান হবে। ত্রিপুরার উন্নয়নে এখানকার মানুৃষর দীর্ঘদিনের যে স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন পূরণ করবে ফেনী ব্রিজ। মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ত্রিপুরাসহ সাতটি রাজ্যের সংযুক্তির ‘গেটওয়ে’ হিসেবে ব্যবহার হবে ফেনী ব্রিজ। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রামগড় স্থলবন্দর চালু হলে বাংলাদেশ থেকে প্রসাধন সামগ্রী, সিরামিক ও মেলামাইল পণ্য, সিমেন্ট, ইট, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, তামাক জাতীয় পণ্য, শুঁটকি মাছ প্রভৃতি ত্রিপুরা রাজ্যে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, ত্রিপুরা থেকে কাঠ, বাঁশ, পাথর, মসলা প্রভৃতি পণ্য আমদানি করা যাবে। প্রসার ঘটবে পর্যটন শিল্পের। সীমান্তের ওপারের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, মৈত্রী সেতু নির্মাণের সমানতালে সেখানকার অভ্যন্তরীণ মহাসড়কের উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর উন্নয়ন কাজও চলছে জোরেশোরে। গত ৩ অক্টোবর সাব্রুম থেকে আগরতলা রেল সার্ভিস চালু করা হয়েছে। সাব্রুমে স্পেশাল ইকোনমিক জোন গড়ে তুলতে বিপুল পরিমাণ জমিও অধিগ্রহণ করেছে।

এদিকে, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সরওয়ার উদ্দিন জানান, মৈত্রী সেতু ও এপ্রোচ রোড নির্মাণের জন্য ২.৮৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়েছে। বন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামো স্থাপনের জন্য ১০ একর   ভূমিসহ কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, বিজিবি ও পুলিশ চেক পোস্ট ইত্যাদি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের   কার্যক্রম চলছে।