গোপালপুরে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা

শ্রেণিকক্ষে শৈল্পিক চিত্র শিশুরা শিখছে আনন্দে

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ২১:০১

পুরো স্কুল ভবন গাঢ় লাল-সবুজের পতাকায় আপাদমস্তক মোড়ানো। যেন আয়ত মানচিত্রে এক খণ্ড গর্বিত বাংলাদেশ। আর ভিতরের শ্রেণিকক্ষগুলো যেন প্রাচীন ভারতের অনতিক্রম পর্বতের ইলোরা আর অজন্তা গুহা। যেখানে শুধুই দৃষ্টিনন্দন মিনিয়েচার শৈল্পিক ছন্দে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

পড়ার ছলে শেখা নয়, নান্দনিক পরিবেশে ছবি একে, ছবি দেখে আল্পনার রঙে মনের মাধুরী মিশিয়ে শিখন, পঠনপাঠন করছে শিশুরা। এটি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের সম্প্রতিক চিত্র।

এ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬১। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিবছর প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টুকটাক মেরামত, সংস্কার ও শিক্ষাসরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য স্লিপখাতে ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, ক্লাসরুটিন মেরামতে ৪০ হাজার টাকা, প্রাক প্রাথমিক ক্লাস সজ্জিতকরণে ১০ হাজার টাকা, ওয়াশ ব্লক পরিচ্ছন্নকরণে ২০ হাজার টাকা, ক্রীড়ানুষ্ঠানের জন্য ৪ হাজার টাকা, শোক দিবস পালনে ২ হাজার টাকা, বই বিতরণে ৪০০ টাকা এবং আনুসঙ্গিক কাজে ৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়ে থাকে। স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি বরাদ্দ পাওয়া টাকায় কাজ করার কথা। কিন্তু সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের মধ্যে প্রায়ই টাকা নয়ছয় নিয়ে রশি টানাটানি চলায় সুফল মেলে না। এমতাবস্থায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস দুই বছর ধরে মাঠ পর্যায়ে বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করে। এর সুফলও মিলেছে।

সরকারের বরাদ্দকৃত টাকায় স্কুল ভবনের টুকটাক সংস্কার ও মেরামত ছাড়াও শিক্ষাসরঞ্জাম ক্রয়, স্কুল সংলগ্ন মিনি পার্ক নির্মাণ স্কুল ভবনকে জাতীয় পতাকার আদলে লালসবুজ রঙে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। চলতি অর্থ বছর পেশাদার চারু ও কারু শিল্পী দিয়ে স্কুলের ক্লাসরুমকে অপরূপ শৈল্পিক চিত্রে সাজানো হয়েছে। নানা রঙের মিশেলে মোলায়েম তুঁলির আঁচড়ে ফুল, ফল, লতাপাতা, আকাশ, নদী, জলঙ্গী মূর্ত হয়ে উঠেছে। দেয়াল চিত্রে কখনো মুক্তিযুদ্ধ, কখনো স্বাস্থ্য বা পরিবেশ শিক্ষা, কখনো বর্ণমালা বা অঙ্কশাস্ত্রের হাতেখড়ি দেদিপ্যমান। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের চতুর্ভুজ দেয়ালে যৌতুক, বাল্য বিয়ে, মাদককে না এবং সুনাগরিকের নীতিনৈতিকতা অথবা প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কের রসায়ন রং তুলির ছত্রাক্ষরে অঙ্কিত হয়েছে।

বণমালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীমা ইয়াসমিন ঝর্ণা জানান, শিক্ষার সঙ্গে শিল্পের এবং পড়ার সঙ্গে পরিপ্রেক্ষিতের মিল রেখে সব কিছুকে শৈল্পিক ও নৈসর্গিক বিন্যাসে সাজানোয় শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যে দারুণ প্রভাব পড়েছে। শিশুরা বাড়ির মতোই তথা চিরচেনা পরিবেশে খেলাচ্ছলে লিখন ও পঠনপাঠন সারছে।

নবগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আব্দুল মজিদ জানান, দুই বছর ধরে বরাদ্দকৃত টাকা সঠিকভাবে ব্যয় হওয়ায় তার স্কুল এখন আদর্শ গুরুগৃহ। যেখানে শিশুরা প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত হাতে কলমে, আনন্দ বিনোদনে শিক্ষা নিচ্ছেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রফিকুল ইসলাম রুমী জানান, দেশের অনেক স্থানে স্কুল সভাপতি আর প্রধান শিক্ষক মিলে সরকারি বরাদ্দের এ টাকা মেরে দেওয়ার ধান্দায় থাকেন। তিনি এখানে যোগদানের পর দুই বছর ধরে সরকারি খাতের এ টাকা সঠিকভাবে ব্যয় করার চেষ্টা করেছেন। এখনো কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। তবুও অধিকাংশ বিদ্যালয়ের ভিতর বাইরের দৃশ্যপট পালটে গেছে। শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশে গুণগত পরিবর্তন এসেছে। পরীক্ষার ফলাফলেও মিলেছে সুফল। গোপালপুর হতে পারে একটি মডেল। তিনি আরো জানান, এ পর্যন্ত ৯৮টি প্রাইমারি বিদ্যালয়ে উল্লেখিত কাজ শেষ হয়েছে। বাকীগুলোতে একই ধরনের কাজ চলমান রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিকাশ বিশ্বাস জানান, শিশু মনস্তত্বকে গুরুত্ব দিয়ে শৈল্পিক শিক্ষা এখন অপরিহার্য। গোপালপুরে এখন সেটি হচ্ছে।