রাজশাহী নার্সিং কলেজে কেনাকাটায় পুকুরচুরি!

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ২২:০৬

রাজশাহী নার্সিং কলেজের কেনাকাটায় পুকুরচুরির অভিযোগ উঠেছে। মালামাল ক্রয় না করেই বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থব্যয় প্রদর্শন ও আত্মসাত্সহ অধ্যক্ষ ও প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পাহাড় জমেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ শেফালী খাতুন কোনো কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এ প্রতিবেদকের তথ্য জানার এখতিয়ার নিয়ে উলটো প্রশ্ন তোলেন। প্রধান সহকারী কিছু না বলে অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী নার্সিং কলেজে টেন্ডার আহ্বান ছাড়াই মালামাল ক্রয়ের ব্যয় প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। বাস্তবে কোনো মালামাল ক্রয়ই করা হয়নি। সূত্র জানায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দের প্রায় ৬৮ লক্ষ টাকার অডিট আপত্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কেনাকাটায় পুকুরচুরির অভিযোগ সামনে আসে। মূলত এরপর থেকেই বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থের লুটপাট চলছে বলে অভিযোগ। ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৮-১৯ পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দ, ক্রয়ের টেন্ডার ও ক্রয় কমিটি, স্টক রেজিস্টার ও বিদ্যমান মালামালের অনুসন্ধান যাচাই করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে জানা যায়। এছাড়া পুরাতন মালামাল বিক্রির ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি নিলাম বিধি ভঙ্গ করে ৬১টি আইটেমের ৫৫৭টি পুরাতন মালামাল গোপনে মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন অধ্যক্ষ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত অডিট অধিদপ্তরের এক আপত্তির উদ্ধৃতি দিয়ে সূত্র জানায়, বিভিন্ন উপকরণ বাবদ ৩২ লক্ষ ৫৪ হাজার ৬৫৫ টাকা খরচ দেখানো হলেও বাস্তবে তা পাওয়া যায়নি। তবে একইপত্রে ১৩ লক্ষ ৫৪ হাজার ১১৬ টাকা নিষ্পত্তি এবং অবশিষ্ট ১৯ লক্ষ ৫০ হাজার ৫৫০ টাকার মালামাল না কিনে ব্যয় প্রদর্শনের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করতে বলা হয়। কিন্তু তত্কালীন অধ্যক্ষ সাদেকা খাতুন সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে অর্থ ফেরত ছাড়াই ক্ষমা প্রার্থনার চিঠি দিয়ে পার পেয়ে যান। সদ্যবিদায়ী অধ্যক্ষ মনিজ্জা খাতুনের আমলে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি বার্ষিক বরাদ্দ এনে একই কায়দায় আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান অধ্যক্ষ শেফালী খাতুনের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ।

সূত্র মতে, পুকুরচুরির মূলহোতা প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক গোলাম মোস্তফা প্রায় ২০ বছর ধরে রাজশাহী নার্সিং কলেজ এবং ডিভিশনাল কন্টিনিউইং এডুকেশন সেন্টারে (ডিসিইসি) কর্মরত। ফলে যখন যিনি অধ্যক্ষ হন, তাকেই তিনি অর্থের বিনিময়ে কব্জা করেন। এরপর যোগসাজশ করে বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থে টেন্ডার ছাড়া কেনাকাটার নামে আত্মসাত্ করেন। এক্ষেত্রে ৫/১০ বছরেও নষ্ট হয় না, এমন মালামাল বার বার ভাউচারের মাধ্যমে ক্রয় দেখানো হচ্ছে। তারা বার্ষিক উন্নয়ন বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব সংশ্লিষ্ট কাউকে জানতে দেন না। প্রধান সহকারী তানোরে ৭০ বিঘা জমি কিনেছেন। তিনি রাজশাহীর চন্দ্রিমায় চারতলার বিলাসবহুল বাড়িসহ বিপুল ধন-সম্পদের মালিক বলেও জানা যায়। শিক্ষার্থীরা জানান, প্রথম বর্ষে ভর্তির সময় অধ্যক্ষ শিক্ষার্থী প্রতি ৯ হাজার ৮০০ টাকা আদায় করেন। ভর্তির সময় অর্থ আদায় সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন অধ্যক্ষ শেফালী খাতুন। এ বিষয়ে নার্সিং অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (শিক্ষা) ফাতেমা বেগম বলেন, ভর্তির সময় সব ফি একত্রে সাড়ে তিন হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।

এদিকে একাডেমিক বা স্টাফ কাউন্সিল ছাড়াই কলেজ পরিচালনা করেন অধ্যক্ষ শেফালী খাতুন। কলেজে ৩০ শিক্ষক থাকলেও আন্তঃপরীক্ষাসহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষা কমিটিতে নিজে সভাপতি ও ঘনিষ্ঠ মাহফুজা খাতুন বিউটি ও রওশন আরা কচিকে সদস্য করেন। এ সুবাদে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সেটার, মডারেটর, ভিজিলেন্সসহ সংশ্লিষ্ট সকল আর্থিক কাজেই অধ্যক্ষ নিজে ও তার অনুগত শিক্ষকদের নিয়োজিত করেন। কলেজের ক্লাস রুটিনেও পরীক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিতদের প্রাধান্য দেখানো হয়। অন্যান্য শিক্ষকরা ক্লাস-পরীক্ষার দায়িত্ব চাইলে অভিজ্ঞতার অজুহাতে তাদের অসম্মান করেন।