নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধ না থাকুক, না পাওয়া যাক সোনারঙা শস্যের দেখা তারপরও রাজধানীবাসীর মনে লেগেছিল নবান্নের আনন্দ। নবান্ন হচ্ছে গ্রাম-বাংলায় নতুন ফসল ওঠার উত্সব। কৃষকের ঘরে ঘরে নতুন ফসল ওঠাকে কেন্দ্র করে আনন্দ আয়োজন শুরু হয়। গতকাল ছিল পহেলা অগ্রহায়ণ। বাংলার কৃষকের ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে নতুন ফসল তোলার ধুম। সেই আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল শহরবাসীর মনেও। রঙিন সাজে সেজে চারুকলার বকুলতলায় নবান্ন উত্সবে মেতে উঠেছিল নগরবাসী।
হিম হিম হেমন্তের সকালে মেয়েরা গায়ে হলুদ শাড়ি, খোঁপায় গাঁদা ফুলের মালা আর ছেলেরা গায়ে হলুদ পাঞ্জাবি জড়িয়ে মেতে ওঠে উত্সবে। নাচ-গান, নবান্ন কথনের পাশাপাশি ছিল শোভাযাত্রা। শনিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় জাতীয় নবান্ন উত্সব উদ্যাপন পর্ষদ আয়োজন করে একুশতম নবান্ন উত্সবের। জাতীয় নবান্ন উত্সব উদ্যাপন পর্ষদের এই শেকড়সন্ধানী উত্সবে নৃত্য-গীত ও বাদ্যে হেমন্ত বন্দনা এবং নবান্নের কথা যেমন হলো, একইভাবে উঠে এসেছে বর্তমানে গ্রাম-বাংলায় কৃষকের দুর্দশার কথাও।
গতকাল শনিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় বাঁশিতে লোকজ সুরে আমন্ত্রণ জানানো হয় দর্শকদের। এরপর ছিল ঋতুভিত্তিক গানের সম্মেলক পরিবেশনা। একক গান, দলীয় নৃত্য, একক আবৃত্তি পর্বে সাজানো হয়েছিল নবান্ন উত্সবের প্রথম ভাগ। উত্সবের উদ্বোধন করেন নাট্যব্যক্তিত্ব ফেরদৌসী মজুমদার। বিশেষ অতিথি ছিলেন রামেন্দু মজুমদার। সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নবান্ন উত্সব উদ্যাপন পর্ষদের চেয়ারম্যান লায়লা হাসান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন পর্ষদের সদস্য সজিব মানজারে চৌধুরী সুইট।
ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, ‘জীবন এখন খুব যান্ত্রিক হয়ে গেছে। এখানে এসে দেখছি, কী চমত্কার রঙিন পরিবেশ। জীবনে এসবেরও প্রয়োজন রয়েছে। এ নবান্ন উত্সব, চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ—এগুলো বাঙালির ঐতিহ্য। এ উত্সবগুলো আমাদের ঘটা করে, অন্তর দিয়ে উদ্যাপন করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রকৃতি আমাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, এটাকে ভুললে চলবে না। গ্রাম-বাংলার যে ঐতিহ্য, এটা রক্ষা করেই শহুরে জীবনে বৈচিত্র্য আনতে হবে।’
ঋতুভিত্তিক এসব উত্সবের মাধ্যমে নগরজীবনে অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘এ উত্সবের সবচেয়ে বড়ো দিক, এটি মানবিক চেতনার উত্সব, অসাম্প্রদায়িক উত্সব। আজকে মানবিক চেতনা খুব জরুরি আমাদের দেশের জন্য।’
উত্সবে দলীয় নৃত্য পর্বে পারফর্ম করে নটরাজ, নৃত্যজন, নন্দন কলা কেন্দ্র, স্পন্দন, বকুল নৃত্যালয়। দলীয় সংগীত পরিবেশন করে বহ্নিশিখা, বুলবুল একাডেমি অফ ফাইন আর্টস (বাফা), সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, সুরতীর্থ। একক সংগীত পর্বে সালমা আকবর শোনান রবীন্দ্র সংগীত ‘সেদিন আমায় বলেছিলে’, মাহজাবিন রহমান শাওলী শোনান নজরুল সংগীত ‘হৈমন্তিকা এসো এসো’, নবনীতা জাইদ চৌধুরী অনন্যা শোনান ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায়’। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন নায়লা তারান্নুম কাকলি ও বেলায়েত হোসেন। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শেষে বকুলতলা থেকে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে বের হয় নবান্ন শোভাযাত্রা। নবান্ন উত্সবের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় বিকাল পাঁচটায়। সে পর্বে দলীয় সংগীতে অংশগ্রহণ করে সুরবিহার, স্বপ্নবীণা, মন্দিরা, প্রার্থনা, ঢাকা স্বরকল্পন, কিশলয় কচি-কাঁচার মেলা, সমস্বর, স্বভূমি লেখক শিল্পীকেন্দ্র, পঞ্চভাস্কর, দৃষ্টি, ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী, সংস্কৃতি মঞ্চ, পঞ্চায়েত। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস্, নান্দনিক নৃত্য সম্প্রদায়, দিব্য, নৃত্যালোক, বকুল নৃত্যালয়, নৃত্যমঞ্চ, স্বপ্ন বিকাশ কলা কেন্দ্র। একক আবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করেন ইকবাল খোরশেদ, রফিকুল ইসলাম, রেজিনা ওয়ালী লীনা, ফয়জুল আলম পাপ্পু, মাহমুদা আখতার প্রমুখ। একক সংগীত পরিবেশন করেন চম্পা বণিক, সর্দার রহমত উল্লাহ, খগেন্দ্রনাথ সরকার, আবু বকর সিদ্দিক, অনিমা মুক্তি গোমেজ, মহাদেব ঘোষ, তামান্না নিগার তুলিসহ আরো অনেকে। দলীয় আবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করে মুক্তধারা সংস্কৃতি ও আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র।
