কুমিল্লার শরীফ হত্যা

প্রেমিকার কারণেই খুন হন তিনি

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ২৩:৪৬

রেলওয়ে থানা পুলিশের ধারণা ছিল ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছে শরীফুল ইসলাম। থানায় এমন অভিযোগে অপমৃত্যুর মামলাও হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে মামলা তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য বের করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দুর্ঘটনা নয়, প্রেমের কারণেই হত্যা করা হয়েছিল কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার গোলাচৌ গ্রামের সিরাজুল হকের ছেলে শরিফুল ইসলাম শরীফকে। এ ঘটনায় শরীফের প্রেমিকা রহিমা আক্তারকে গ্রেফতারের পর সে গত শুক্রবার কুমিল্লার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত রহিমা আক্তারের মামা আবু তাহেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার অপর আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। শনিবার সন্ধ্যায় পিবিআই কুমিল্লার পুলিশ পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

মামলার অভিযোগ ও পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর শরিফুল ইসলাম শরীফের (২২) লাশ উদ্ধার করে লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশ। লাশটি উদ্ধারের পর ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছে এমন ধারণা নিয়ে রেলওয়ে থানা পুলিশ একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। তবে লাশের শরীরে অসংখ্য আঘাতের দাগ আর হাত ভাঙা দেখে কিছুতেই বিষয়টি দুর্ঘটনা বলে মেনে নিতে পারেননি শরীফের বাবা সিরাজুল হক। তিনি ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর কুমিল্লার আদালতে ছেলে শরীকে হত্যা করা হয়েছে, এমন অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ফের লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্তের পর শরীফ ট্রেনের ধাক্কায় অর্থাত্ দুর্ঘটনায় মারা গেছে বলে রেলওয়ে থানা পুলিশ আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে। এরপর রেলওয়ে পুলিশের ঐ রিপোর্টের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী সিরাজ। ঐ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআই কুমিল্লাকে নির্দেশ দেয় আদালত। অবশেষে পিবিআইয়ের তদন্তে বের হয়ে আসে ট্রেনের ধাক্কায় নয়, এক মেয়েকে ভালোবাসার কারণে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছিল শরীফকে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুই জনকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই কুমিল্লার পুলিশ পরিদর্শক মো. মতিউর রহমান জানান, ‘প্রায় ২০ দিন আগে আমি মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করি। তদন্ত শুরুর পর প্রথমেই জানতে পারি সদর দক্ষিণ উপজেলার উত্সব পদুয়া গ্রামের মোরশেদ আলমের মেয়ে রহিমা আক্তার শিপার (২১) সঙ্গে  শরীফের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত বৃহস্পতিবার শিপাকে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানাধীন টাকিয়াকদমা গ্রামে তার বর্তমান শ্বশুর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করি। এরপর তাকে কুমিল্লায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি। একপর্যায়ে সে পুরো ঘটনা স্বীকার করে জানায়, ভিকটিম শরীফের সঙ্গে তার মামা আবু তাহেরের মাধ্যমে পরিচয় ঘটে। এরপর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু কোনোভাবেই তাদের প্রেমের বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি তার মামা আবু তাহের। এজন্য বিভিন্নভাবে শরীফকে হুমকিও দেয় তাহের। ঘটনার কয়েকদিন আগে শরীফ প্রেমিকা রহিমার বাড়িতে দেখা করার জন্য গেলে তার আরেক মামা বিষয়টি দেখে ফেলে। এ সময় ঐ মামাও শরীফকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এরপর বেশ কয়েকদিন পর রহিমা শরীফকে দেখা করার জন্য উত্সব পদুয়া গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইনের পাশে আসতে বলে। ঘটনার দিন ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর শরীফ প্রেমিকার কথানুযায়ী সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঐ রেললাইনের ধারে আসে। এরপর আগে থেকে সেখানে ওত পেতে থাকা রহিমার মামা আবু তাহেরসহ আরো কয়েকজন শরীফকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। তার ডান হাতও ভেঙে ফেলা হয়। এরপর শরীফকে তারা মুমুর্ষূ অবস্থায় রাস্তায় নিয়ে আসে এবং ট্রেনের ধাক্কায় আহত হয়েছে বলে চিত্কার শুরু করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার   মৃত্যু হয়।