আইএস কি ছড়িয়ে পড়বে সর্বত্র!

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৩২

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

সিরিয়ার মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএসের প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদি নিহত হওয়ার পর বিশ্লেষকরা নানা ধরনের পর্যবেক্ষক প্রদান করছেন। এটি সত্য যে, আপাতত আইএসের পতন ঘটেছে। কিন্তু নিকট-ভবিষ্যতে এবং অবশেষে আইএসের সমাপ্তি ঘটবে—এটা মনে করা খুবই কঠিন। আইএস খেলাফতের পতন ও বাগদাদির মৃত্যুর পর বিশ্ব জুড়ে নিরাপত্তা হ্রাস পাবে বলে পাশ্চাত্য আত্মপ্রসাদ লাভ করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, আইএস যে মিশন ও ভিশনে বিশ্বাস করে, তা সমাপ্ত হওয়ার নয়। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, আইএস তার মূলভূমি থেকে উত্খাত হলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা বিশ্বে। তাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে এবং আদর্শিক লক্ষ্যের কারণে এটি সম্ভব হতে পারে। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক দখলের পটভূমিতে জন্ম নেয় আইএস। তারা ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পাশ্চাত্যের কার্যক্রমকে নেতিবাচকভাবে বর্ণনা করে। ফিলিস্তিনি জনগণের উদ্বাস্তু অবস্থা, আল আকসা মসজিদের দখল, আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধ এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রে উত্থিত মুসলিম বিদ্বেষকে পুঁজি করে। সাদ্দাম হোসেনের সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত ও পরাজিত অংশ আইএসের প্রধান অংশীদার হয়ে দাঁড়ায়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং কুর্দিদের নানা ধরনের বিভক্তি তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে সরকারি বাহিনীগুলোর কাছ থেকে ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা দখল নিয়ে আইএস খেলাফত ঘোষণা দেয়। উল্লেখ্য, একসময়ে ‘খেলাফত’ শব্দটি গোটা মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক ছিল। ১৯২৩ সালে তুরস্ক কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাফতের অবসান ঘোষণা করা হলেও এর অনুরণন রয়েছে সর্বত্র। ১৯২১ সালে অবিভক্ত উপমহাদেশে ঐ খেলাফত রক্ষায় আন্দোলন হয়েছিল। আইএস প্রধান আবু বকর আল বাগদাদি ২০১০ সালে সেই খেলাফতের আবেগ ধারণ করে নিজেকে ‘খলিফা’ বলে ঘোষণা করেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের কোবান শহরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মাধ্যমে আইএসের খেলাফতের পতন শুরু হয়। সেই পতনের শেষ হয় চলতি বছরের মার্চে সিরিয়ার বাঘৌজ শহর হারানোর মধ্য দিয়ে। অবশেষে তথাকথিত খলিফা বাগদাদির জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটল।

এ মাসের (নভেম্বরের) ২ তারিখে সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের বারিশা নামের একটি গ্রামে এক বাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ বাহিনীর অভিযানের মুখে বার্তা সংস্থার খবর অনুযায়ী পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বাগদাদি। পরে একটি সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে গিয়ে শরীরে বেঁধে রাখা ‘সুইসাইড ভেস্ট’ বস্ফািরণ ঘটিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। সেই সঙ্গে তার তিন সন্তানও নিহত হয় বলে দাবি করা হয়। বাগদাদি লড়াইয়ের শেষ প্রান্তে প্রত্যন্ত গ্রামে আত্মগোপন করেছিলেন। সে সময়ে মেষপালকের বেশ ধারণ করেছিলেন বলে জানা যায়। ইতিপূর্বে বাগদাদির মৃত্যুর খবর রটেছিল অনেকবার। এবার অবশ্য আইএস সদর দপ্তর তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। বাগদাদির উত্তরসূরির নামও ঘোষণা করা হয়েছে। তার নাম আবু ইবরাহিম আল হাশেমি আল কুরেশি। গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবু ইবরাহিম নামটি তাদের কাছে পরিচিত নয়। তবে বিভিন্ন উপায় এজেন্সির লোকেরা তার পরিচয় উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন। তিনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের পরিচয় জানতে সিগন্যাল ইনটেলিজেন্স বা সাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে আইএস নেতা ও নিম্নপদস্থ কর্মীদের মধ্যকার ফোনকল, টেক্সট মেসেজ এবং যে কোনো ধরনের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা। তবে রহস্যজনক ব্যাপার হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আইএসের প্রধানকে আমরা ভালোভাবেই চিনি।’

সাম্প্রতিক কালে তুর্কি মার্কিন সম্পর্কের টানাপোড়েনের ফলে সন্ত্রাস দমনে তথা আইএস নিধনে তুরস্কের আন্তরিকতা নিয়ে পাশ্চাত্য মহলে সন্দেহ দেখা দেয়। এরদোয়ানের মুসলিম বিশ্বকেন্দ্রিক তথা ইসলামি রাজনীতি হচ্ছে সন্দেহের মূল কারণ। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের যোগাযোগ পরিচালক ফাহারেতিন আলতুন বলেছেন, আইএসের বিরুদ্ধে তুরস্ক যে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ তারই প্রমাণ বাগদাদির বোনকে আটকের ঘটনা। তিনি একে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সফলতা বলে বর্ণনা করেন।

বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকরা আইএসে যোগদান করেছিল। বাংলাদেশের নাগরিকরাও এর মধ্যে রয়েছে। আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে পাশ্চাত্যে অবস্থানরত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মেধাসম্পন্ন লোকেরা আইএসে নাম লিখিয়েছিল। তাদের সর্বনাশের পর এখন যখন স্ব স্ব দেশে যখন তারা ফিরছে তখন সবাই গ্রেফতার হচ্ছে, শাস্তি ভোগ করছে, এমনকি হত্যার শিকার হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই তথাকথিত আইএস রাষ্ট্রের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে তাদের পলায়ন এবং আশ্রয় গ্রহণই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে তুরস্ক, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান এবং সৌদি আরবে তাদের অল্পবিস্তর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সংবাদমাধ্যম এবং গোয়েন্দা তথ্য বলছে, এদের সিংহভাগ আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। সেদেশের গৃহযুদ্ধ এবং ইসলামি বৈশিষ্ট্য আশ্রয় গ্রহণের প্রধান কারণ। আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাদের উত্পাত শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে তা আফগান সরকারের গোচরীভূত হয়েছে। কিন্তু তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, শক্তিশালী তালেবান গোষ্ঠী তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে না। তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষও হয়েছে। একদল মার্কিনপন্থি বিশেষজ্ঞ কাবুল সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে—কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার। তারা বলছে, বিতাড়িত আইএসকে ব্যবহার করে তালেবানদের মোকাবিলা করতে। ভারতীয় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক সাইয়্যেদ নাকভি তার এক ভাষ্যে দেখিয়েছেন যে, বাগদাদিরা অতীতে নানা ধরনের শক্তির প্রতিভূ হয়ে কাজ করেছে। ভবিষ্যতে তার অনুসারীরা তাই করবে। তিনি বলেন, বাগদাদিকে সৃষ্টি যারা করেছে, তারাই তাকে টেনেহিঁচড়ে সিরিয়ার ইদলিশে নিয়ে গেছে। এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাগদাদির মৃত্যুকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলবার বাহানা হিসেবে ব্যবহার করছে। ট্রাম্প বলছেন, এটি ওসামা বিন লাদেন হত্যার চেয়েও বড়ো ধরনের কৃতিত্বপূর্ণ কাজ। ২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প নিঃসন্দেহে এ কৃতিত্ব কাজে লাগাবেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক রোদিওন ইব্বিঘাওসেন মন্তব্য করেছেন যে, বিতাড়িত ও পরাজিত আইএস সেনাদের উর্বর বিচরণক্ষেত্র হতে পারে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। তিনি গত অক্টোবরে নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী উইরান্তু-এর দুই-দুবার করে সন্ত্রাসী দ্বারা আটকের উল্লেখ করেন। নিরাপত্তা মন্ত্রীকে আক্রমণ যে করেছে, সে স্থানীয় জঙ্গি সংগঠন ‘জামা আনসার উদদৌলা’র সদস্য। তিনি দাবি করেন, সংগঠনটি আইএসের সঙ্গে যুক্ত। তিনি আরো তথ্য দেন, জঙ্গিবাদী আবু সায়াফ গোষ্ঠী সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সক্রিয় একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। এদের শাখা-প্রশাখা রয়েছে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ায়। তার ভাষায়, যদিও সবাই আইএসের সদস্য না হলেও তারা পারস্পরিক যোগসাজশ রেখেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০০২ সালে বিনোদন শহর বালিতে সন্ত্রাসী আক্রমণের কথা বলেন। ঐ ঘটনার দায় স্বীকার করেছিল, ‘জামিয়া ইসলামিয়া’। সেই সময়ে অবদমিত হলেও এখন তারা শক্তি সঞ্চয় করেছে। ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের দুজন বিশেষজ্ঞ জাকারি আবুজা এবং কলিন ক্লার্ক একটি গবেষণা শেষে মন্তব্য করেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে উঠতে পারে ইসলামি জঙ্গিদের নতুন ঠিকানা। তারা আইএসের দিকে তাকিয়ে এ কথা বলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক গঠন, হাজারো দ্বীপসমষ্টি এবং মুসলিম এলাকা আইএসদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এ বছরের এপ্রিল মাসে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা ঘটে। পরে আইএস তার দায় স্বীকার করে। ফ্রাংকফ্রুর্টভিত্তিক বৈশ্বিক ইসলামবিষয়ক গবেষক সুশানে স্করোটা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রেও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগসাজশে আরো ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি তথ্য দেন, ২০১৪ থেকে আইএস ‘আল ফাতেহিন’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করে আসছে। ২০১৮ সালে ইন্দোনেশিয়ায় ১১টি, ফিলিপাইনে ছয়টি আত্মঘাতীর ঘটনা ঘটে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, মালয়েশিয়ায় গত ছয় বছরে ৫০০ সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্য মতে, মালয়েশিয়ার সংবাদপত্র ব্যানার নিউজ খবর দেয়, ৫৩ জন মালয়েশিয়ান ও ১০০ জন ইন্দোনেশিয়ান আইএস যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসবে বলে তথ্য রয়েছে। সন্ত্রাসীদের বড়ো আরেকটি হামলার উদাহরণ দেন রোদিওন। তিনি ২০১৭ সালে ফিলিপাইনের মুসলিম বিদ্রোহীদের কর্তৃক মারাউই শহর দখল করে নেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করেন। এসব ঘটনা ব্যাখ্যা করে তিনি সরকারসমূহের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অসহায়ত্বের কথা বলেন। তিনি আরো মন্তব্য করেন, মুসলিম মনস্তত্ত্বে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। ইন্দোনেশিয়ার যুব সমাজে ইসলামের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক সেই মোর হার্শ মন্তব্য করেন, ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আল-কায়েদা শেষ হয়ে যায়নি। অনুরূপ বাগদাদির মৃত্যু বা আইএসের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আইএস শেষ হয়ে যাবে না। শুধু যুদ্ধ দ্বারা এদের স্বরূপ বোঝা যাবে না। এটি হচ্ছে একধরনের ‘স্টেট অব মাইন্ড’। রাজনৈতিক দার্শনিকরা সেই প্রাচীনকাল থেকে বলে আসছেন, ‘রাজনীতির মোকাবিলা রাজনীতি দিয়েই করতে হয়। শক্তি প্রয়োগ কেবল শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাকেই জোরদার করে।’

n লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়