উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি পেলে দেশের অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়বে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ আর কম সুদের ঋণ পাবে না। তখন বেশি সুদের ঋণ নিয়ে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। গতকাল বুধবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত আঙ্কটাড এলডিসি রিপোর্ট ২০১৯ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এ সময় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদ খাতুন, সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান গবেষণাপত্র উপস্থাপন করে বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী দেশগুলো আর্থিক সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দিয়েছে। অনুদানের তুলনায় বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরিমাণ এখন বেশি, যা উন্নয়নশীল দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সঞ্চয়-বিনিয়োগ, আর্থিক খাত এবং বৈদেশিক লেনদেন এই তিন খাতেই ঘাটতি আছে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য বৈদেশিক ঋণ নিতে হয়। এই ঋণের কিছু অভ্যন্তরীণ আর বাকিটা বিদেশ থেকে নিতে হয়। তাই বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা আছে এবং ভবিষ্যতেও বেশ ভালোভাবেই থাকবে। এটা বিকাশমান অর্থনীতির একটি চরিত্র। এটা অর্থনীতির নেতিবাচক দিকও নয়। গত এক দশকে দেশের উন্নয়নে বৈদেশিক ঋণের একটা ভালো অংশগ্রহণ আছে। এই সময়ের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ যেভাবে মসৃণভাবে পাওয়া গেছে এবং যে দায়দেনা এসেছে তা এখনো আমাদের আয়ত্তের ভেতরে আছে। বাংলাদেশ কোনো দিন বৈদেশিক দায়দেনা পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। তবে গত দু-তিন বছরে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ বেশ বেড়ে গেছে। এর প্রায় সবটাই ঋণ। অনুদানের অংশ খুব কম। এর ফলে দায়দেনা বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণ ব্যবহারে যতটা দ্রুততা ও দক্ষতা দরকার সেভাবে হচ্ছে না। অর্থাত্ যত ঋণ নিচ্ছি ততটা ব্যবহার করতে পারছি না। এখনো বাংলাদেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় ৩৭ শতাংশ বৈদেশিক সহায়তানির্ভর। এই বৈদেশিক সহায়তার প্রায় ৪৭ শতাংশ আমরা সামাজিক উন্নয়ন খাতে ব্যবহার করছি এবং ৪৪ শতাংশের মতো আমরা আর্থিক অবকাঠামোতে ব্যবহার করছি। অর্থাত্ আমাদের সামাজিক উন্নয়ন এবং আর্থিক অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন বৈদেশিক ঋণের ওপর ভালোভাবে নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে সাশ্রয়ীভাবে বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে যে পরিমাণ কর আহরণ হয়েছিল তার ৩৬ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়েছিল। মিথ্যা ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিতে ৭ শতাংশের মতো রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। তাই অর্থপাচার রোধ করার দক্ষতা অর্জন করে অভ্যন্তরীণ কর বাড়ানোর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় বলেন, উন্নয়নশীল দেশ হয়ে গেলে বাংলাদেশ বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় অর্থায়নে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে জলবায়ুর জন্য ঋণ ও অনুদান পায়।
এডিপিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তাতে উল্লখযোগ্য অংশ থাকে কম সুদের বৈদেশিক ঋণ। তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার দেশগুলোর প্রথম দিকে কীভাবে বাজারসুবিধা, প্রযুক্তির লভ্যতাসহ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশগুলোর উত্তরণ টেকসই করা যায়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা চলছে। এই আলোচনাকে যদি আমরা কার্যকর করতে চাই, তাহলে জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে একটি সিদ্ধান্ত লাগবে। যদি ঐ সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা নিরাপত্তা পাওয়া যায়।
