আন্তর্জাতিক সংগঠন ও শক্তির ভূমিকায় বাংলাদেশ

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ২২:০৪

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে রুশোর নেতৃত্বে সাম্য-ভ্রাতৃত্ব আর স্বাধীনতার স্লোগান নিয়ে ফরাসি জনগণ ‘ফরাসি বিপ্লব’ চালু করার ফলে ফ্রান্স গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়, স্লোগান হয়, ‘সকল ক্ষমতার উত্স জনগণ’ তখন থেকেই মূলত কর্তৃত্ববাদী শাসক শ্রেণির অবসান ঘটতে থাকে এবং ধীরে ধীরে মানুষ শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতাচর্চার ফলে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে, শুরু হয় আন্দোলন-সংগ্রাম। ঔপনিবেশিকতার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পেছনে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে জাতীয়তাবাদী চেতনা। সূচনা হয় নব্য ঔপনিবেশিকতার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অক্ষ শক্তির পরাজয়ের ফলে মিত্রশক্তির উত্থান ঘটে, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে তৈরি হয় ‘লীগ অব নেশনস’। যদিও সংস্থাটি ব্যর্থতার ফলে পরবর্তীকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পুনরায় বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি হয় জাতিসংঘের।

জাতিসংঘের পাঁচটি স্থায়ী রাষ্ট্র (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, চীন)

 ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে হাত করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে জাতীয় শক্তির জানান দিয়ে থাকে। শুধু তা-ই নয়, সাময়িক জোট গঠনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করতে থাকে, ঠিক তখনই তৈরি হয় জোট নিরপেক্ষ সংস্থা নন-অ্যালাইড মুভমেন্ট (ন্যাম)। জাতিসংঘের পর এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম সংস্থা। বাংলাদেশ তার অন্যতম সদস্য। বাংলাদেশ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনসমূহের সদস্য পদ লাভ করে। জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ন্যাম, ওআইসি, ডি-৮, সার্ক, বিমসটেক তাদের মধ্যে অন্যতম। সদস্য লাভের পর থেকেই বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বশান্তি রক্ষায় ন্যামের ভূমিকা অনেক। সম্প্রতি আজারবাইজানের বাকুতে ১২০টি উন্নয়নশীল দেশের সরকার প্রধানদের উপস্থিতিতে হয়ে গেল ১৮তম ‘ন্যাম’ সম্মেলন। এক ফাঁকে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইরান, মালয়েশিয়া, নেপাল এবং আজারবাইজান সরকার প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ব্যাপারে কথা বলেন, তারাও বাংলাদেশকে সাহায্যের আশ্বাস দেন। তবে এই আশ্বাস কি যথেষ্ট?

আশার বাণী হচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংগঠন আসিয়ান সম্মেলনে চীন-ভারত উভয় দেশই প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য একমত হয়েছে। বিশ্ববিবেক যেখানে ব্যর্থ সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ গাম্ব্বিয়া মিয়ানমারে (রাখাইনে) সংগঠিত গণহত্যার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল (বিবিসি)। এখন মুসলিম বিশ্বসহ বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর উচিত হবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এগিয়ে আসা।

বিশ্বের অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান দৃশ্যমান (০.২৭ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১৩তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ। উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ, প্রবাসী রেমিট্যান্স আর রপ্তানি আয়। দেশ যখন সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে, ঠিক তখনই রোহিঙ্গা ইস্যুটি বারবার সামনে আসলেও কার্যত কোনো সমাধান হচ্ছে না। তাই, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রক্ষার্থে বাংলাদেশের উচিত হবে মৌলিক মানবাধিকার, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা।

 লেখক :পপুলেশন সায়েন্স, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়