মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতে এক কর্মকর্তার বহুমুখী উদ্যোগ

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৮:১১

শিক্ষা এমন একটি অদৃশ্য শক্তি যা কেউ চাইলেও কেড়ে নিতে পারে না। আর এই অদৃশ্য শক্তির প্রাথমিক পর্ব হলো প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হলে মানুষের মানবীয় গুণাবলির উৎকর্ষ সাধিত হয়, তার শিক্ষার ভিত্তি হয় মজবুত। তবে এই শক্তি কীভাবে প্রয়োগ করলে তা মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে তা নিয়ে ভাববার মানুষ খুবই কম। তবে কেউনা কেউতো ভাবেই। আর আমাদের দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন নিয়ে ভাববার দায়িত্বে থাকেন একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। একজন শিক্ষা কর্মকর্তার যোগ্য নেতৃত্বের বদৌলতে যেমন প্রাথমিক শিক্ষার ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয় আবার তার দুর্বল নেতৃত্বের কারণে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা স্তিমিতও হয়ে পড়ে। তবে অনেক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আছেন যারা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে রুটিন কাজের পাশাপাশি বিভিন্নমুখী উদ্যোগী কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকেন। যে উদ্যাগগুলো মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তেমনি একজন উদ্যোগী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হলেন ছিদ্দিকুর রহমান। যিনি বর্তমানে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলায় কর্মরত।

তিনি উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছেন ৩ বছর ধরে। যোগদানের দুই মাসের মধ্যেই তার কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ সেখানকার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো সকল বিদ্যালয়ের লোকেশন বোর্ড বা দিক নির্দেশক সাইনবোর্ড স্থাপন। যার ফলে বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন, মনিটরিং কার্যক্রম সহজতর হয়েছে। যা বর্তমানে বিভাগীয় দপ্তর এর নির্দেশনায় সকল জেলা ও উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব উদ্ভাবনী উদ্যোগে ফলও এসেছে আশানুরূপ। উল্লেখযোগ্য সফলতাগুলোর মধ্যে বিদ্যালয়গুলোতে সময়মত শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বৃদ্ধি, ঝড়ে পড়ার হার হ্রাস, শিক্ষার্থীদের সংখ্যাবৃদ্ধি, সমাপনী পরীক্ষায় পাশের হার বৃদ্ধি, শতভাগ পাশকৃত বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। শুধু মাধবপুর নয় যেখানেই তিনি কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্বপালন করেছেন তার উদ্ভাবনী কার্যকরী উদ্যোগগুলো প্রাথমিক শিক্ষার প্রভূত উন্নতি সাধিত করেছে।

শিশুদের পড়ার দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের মে মাস থেকে ‌‌‌‍‌‌‌‌‌‌শুরু করেন ‘এসো পড়তে শিখি’ শিরোনামে ইনোভেশন প্রজেক্ট বাস্তবায়ন। এর মাধ্যমে সহজতর হয়েছে দুর্বল শিশু সনাক্ত করা। পাশাপাশি শিশুর দুর্বলতা দূর করতে শিক্ষা অফিস কর্তৃক নিয়মিত ফলোআপ-পরিচালনায় পরিচালিত হয়েছে শিক্ষকভিত্তিক দুর্বল শিক্ষার্থী বণ্টন এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিবিড় তত্ত্বাবধান কার্যক্রম। যার ফলে শিশুর পড়াদক্ষতা এবং ফলাফলে অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে।

২০১৬ সালের জুলাই মাসে গ্রহণ করেন, ‘শতভাগ বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল বাস্তবায়ন’ প্রকল্প। উপজেলা পরিষদের সহযোগিতায় সকল বিদ্যালয়ের হত দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিতরণ করা হয় টিফিন বক্স। ঐ বছর সেপ্টেম্বর মাসেই শতভাগ বিদ্যালয়ে শুরু হয় মিড ডে মিল। মিড-ডে মিল ধারণটি বর্তমানে জাতীয়ভাবে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নেতৃত্বে সারাদেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

আরো পড়ুন: পুলিশের উপর হামলা, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতিসহ আটক ৪

‘এগিয়ে যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ এবং আপনার উদ্ভাবনী ধারণা-শিক্ষায় আনবে সম্ভাবনা’- এই স্লোগান দুটোকে ধারণ করে ২০১৭ সালে মাধবপুর উপজেলায় সফলতার সাথে বাস্তবায়িত হচ্ছে বেশ কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ। এরমধ্যে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে- ক্লাস পার্টি, স্থানীয় উদ্যোগে ৪০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্মিত হয়েছে শ্রেণি কক্ষ, শ্রেণি শিক্ষকদের নিজ শ্রেণির প্রতি অধিক মালিকানাবোধ জাগ্রত করতে উদ্ভাবিত হয়েছে ‘শ্রেণি আমার- শিশু আমার; বাতায়ন ৫৬- আলো আসবেই’ অন্যতম।

নিজস্ব উদ্যোগে সকল বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে  ইংলিশ ইন এ্যাকশনের মেমোরি কার্ড (এস.ডি কার্ড) ও টিচারস গাইড। প্রতি বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষকদের নিয়ে আয়োজন করেন ওরিয়েন্টেশন ক্লাসের। ফলে বিদ্যালয়ের দৈনিক সমাবেশসহ শ্রেণি কার্যক্রমে ইংলিশ ইন এ্যাকশনের এ্যকশন পরিলক্ষিত হচ্ছে।

তার প্রেরণায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান ও সহকারী শিক্ষকগণ ইনোভেশন প্রজেক্ট যেমন-কর্মবীর, এসো গড়ি স্বপ্নের স্কুল, কাসরুম দেয়ালিকা, সাথী, এসো শিখি একসাথে, মেটারিয়াল টুলকিটস- ইত্যাদি ইনোভেশন কার্যক্রম উদ্ভাবন ও বাস্তবায়ন করছেন।

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে সকল বিদ্যালয়ে অভিযোগ ও পরামর্শ বক্স স্থাপন, লস্ট অ্যান্ড ফাইন্ড বক্স এর কার্যকর ব্যবহার, কার্যকর সততার স্টোর, দৈনিক সমাবেশে মটিভেশনাল বক্তব্য প্রদান, সু-সজ্জিত ও সুপরিসর বাগান এবং সর্বোপরি পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয় তিনি নিশ্চিত করেছেন। ফল স্বরূপ ২০১৮ সালে সিলেট বিভাগের উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা ক্যাটাগরিতে সেরা শুদ্ধাচার অফিসার হিসেবে ভূষিত হয়েছেন।

আইসিটিতে সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে গ্রহণ করেছেন অভিনব সব উদ্যোগ। আইসিটিতে দক্ষ ও অভিজ্ঞদের নিয়ে গড়েছেন আইসিটি সেল। প্রায় প্রতি মাসেই আইসিটি সংক্রান্ত বিশেষ সভা ও কর্মশালা করেছেন। ফলে উপবৃত্তিসহ ই-প্রাইমারি স্কুল সিস্টেম, ই-ব্যবস্থাপনা, অনলাইন সেবা ও আবেদন পত্র প্রেরণসহ বিদ্যালয়ের যাবতীয় আইসিটি সংক্রান্ত কাজ শিক্ষক এখন নিজেই করতে সক্ষম ।

ই-নথির মাধ্যমে সকল আবেদন নিষ্পত্তির ফলে শিক্ষকগণ অধিক সময় বিদ্যালয়ে পাঠদানে মনোযোগী হতে পারছেন। নিশ্চিত হয়েছে সকল ধরণের হয়রানি ও দুর্নীতি মুক্ত উপজেলা শিক্ষা অফিস, যা মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম নিয়ামক।

তাছাড়া নবনিযুক্ত ও যোগদানকৃত শিক্ষকদের ওরিয়েন্টশন কর্মশালা, শিক্ষকদের ভাল কাজের স্বীকৃতি প্রদান, উপজেলার হিসাব রক্ষণ অফিস থেকে শিক্ষকদের সকল জিপিএফ স্লিপ একত্রে সংগ্রহ ও বিতরণ, ১২ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৮ম শ্রেণিতে উন্নতকরণ সহ বিভিন্ন উদ্যোগী কর্মসূচি শিক্ষা অফিসার কর্তৃক গ্রহণ করা হয়েছে।

ইনোভেশন এসব কার্যক্রমের যথার্থ স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। শিক্ষা অফিসার এর উদ্ভাবিত ‘ক্লাস পার্টি’ ইনোভেশন প্রজেক্টটি ২০১৮ সালে জাতীয় পর্যায়ের ২য় সেরা ইনোভেশন হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে। এর পূর্বের কর্মস্থলে সমাপনী পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের জন্য পেয়েছেন বরিশাল বিভাগের সেরা উপজেলা শিক্ষা অফিসার এর মর্যাদা। ইংলিশ ইন- একশন, ‌কিশোরগঞ্জ মডেল’ এর নির্মাতা হিসেবে নিজ বিভাগ ও ইংলিশ-ইন এ্যাকশন কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়েছেন একাধিকবার। 
শ্রেণিপাঠদান ছাড়াও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ইংলিশ ইন-এ্যাকশন এর এ্যাকশন গানগুলো এখন সবাইকে করছে মুগ্ধ।

ইত্তেফাক/বিএএফ